আসসালামু আলাইকুম — কলম দিয়ে সত্যের সন্ধান
Facebook YouTube ইমেইল
বিজ্ঞাপন

উপন্যাস - বজ্রের শপথ - এইচ আর হারুন আহমেদ - HR Harun Ahmed

বজ্রের শপথ - এইচ আর হারুন আহমেদ 

উপন্যাস - বজ্রের শপথ - এইচ আর হারুন আহমেদ
উপন্যাস - বজ্রের শপথ - এইচ আর হারুন আহমেদ - HR Harun Ahmed



পাঠকের প্রতি এই ছোট্ট উপন্যাসটি একটা সতর্কবার্তা এবং একটা আশার বার্তা - দুটোই। সতর্কবার্তা এই কারণে - আজ আমরা যে পথে হাঁটছি, যেখানে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপ থাকি, যেখানে বিশ্বাসকে শুধু আচার বানিয়ে রাখি, যেখানে প্রযুক্তি আর বিশ্বাসকে শত্রু মনে করি - সেই পথ আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে, এই গল্প তার একটা সম্ভাব্য চিত্র। আশার বার্তা এই কারণে - যত অন্ধকারই আসুক, একজন মানুষ, একটা পরিবার, একটা প্রজন্ম - যদি সত্যের পথে দাঁড়ায়, আল্লাহর সাহায্য আসে। আজকের দিনে - ২০২৬ সালে - আমাদের হাতে এখনো সময় আছে। প্রশ্ন করুন। উত্তর খুঁজুন। জানুন কেন বিশ্বাস করেন। চরিত্র দিয়ে দেখান, শুধু কথায় নয়। জ্ঞান আর বিশ্বাসকে আলাদা করবেন না। কারণ ২২২৬ সালের রহমানের গল্প শুরু হয়েছিল আজকের আমাদের সিদ্ধান্ত দিয়ে। আমরা কী লিখছি - আল্লাহ তা জানেন। আর একদিন সেই লেখা পড়া হবে। 

লেখা শুরু করেছিলাম ৭ জুলাই ২০২৫ #উপন্যাস #বজ্রেরশপথ #hrharunahmed


 

পর্ব ১

২২২৫ সাল।
কোমল বাতাস বইছে ।
একটি ছোট্ট পত্রিকা পড়ে আছে। সেখানে সময়টা ৭ জুলাই ২০২৫। তার পাশে একটি বিশাল মুকুট ভেঙে পড়ে আছে। যার উপরে দাঁড়িয়ে আছে আব্দুর রহমান। একজন ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে আর বলছে - "আব্দুর রহমান! আজ পর্যন্ত কেউ এই মুকুট ভাঙতে পারেনি। এটি তোলার ক্ষমতাও আজ পর্যন্ত কারো ছিল না। তুই আছড়ে ভেঙ্গে দিলি! তোকেই তো খুজতেছি। আয়! আরে আয় না! আমার কাছে আয়।"
"না......... হ্"
আব্দুর রহমান ঘুম থেকে চিৎকার দিয়ে ওঠে।
সে হাঁপাচ্ছে, জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। সে আগে কখনো এতটা রিয়ালিস্টিক স্বপ্ন দেখেনি। মনে হচ্ছে সে বাস্তবে ছিল, হঠাৎ করে আরেকটা বাস্তবতায় তার স্থানান্তর হয়।
আবদুল মান্নান দৌড়ে আসে আর বলে, "কি হয়েছে তোর? আমার তো কিছুই হলোনা।"
তারা দুজন খুব প্রিয় বন্ধু। তারা দুজনই পানি স্পেশালিস্ট।
"চল ঘুমিয়ে পর," বলে আবদুল মান্নান।
আব্দুর রহমান বলে, "আরে! আর মাত্র ৩০ মিনিট পরেই তো ২২২৬ সাল আমাদের জড়িয়ে ধরবে।"
রাত এখনো অন্ধকারের গভীরে।
হলদে ল্যাম্পের নীচে ধূসর শহর, ভেজা দেয়াল, আর কুয়াশায় ঢেকে থাকা এক অচেনা গ্রহ - যেন সময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে বসে আছে। বাইরে দূরের স্ক্রীনে বড় হরফে লেখা, "৩১ ডিসেম্বর, ২২২৫ - পৃথিবীর শেষ সূর্যোদয়।"
আব্দুর রহমানের কপালে ঘাম। বুক উঠছে-নামছে।
"না... না... না..."
চিৎকার করে ওঠে সে, কণ্ঠে আতঙ্ক, চোখে বজ্রের মত জ্যোতি।
দরজার ওপাশে শব্দ হয়, কেউ ছুটে আসে। আব্দুল মান্নান।
শরীরে আধা খোলা জ্যাকেট, হাতে আধফাঁকা মদের বোতল।
"কী হয়েছে তোর রে? আবার সেই কবিতার ধাক্কা খাইলি নাকি?"
তার কণ্ঠে রসিকতা, কিন্তু চোখে চিন্তা।
আব্দুর রহমান নড়ে না। চোখ ছাদে আটকে আছে। যেন ছাদের ওপরে ২০২৫ সাল নিজে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
"বুঝলি মান্নান," সে হঠাৎ ফিসফিস করে বলে, "স্বপ্নে দেখলাম... ২০২৫ সাল... একটা পত্রিকা... তাতে সেই তারিখ... আর একটা ভাঙা মুকুট পড়ে আছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি তার উপরে। আর এক চুলওয়ালা লোক কাঁদছে, বলছে - 'তুইই পারলি, তুইই সেই বজ্রের প্রতিশ্রুতি...' আমি কিছুই বুঝি নাই।"
মান্নান হেসে ফেলে, গলা বাড়িয়ে বলে, "তুই আবার পুরান দিনের চিন্তায় পড়ছিস? ভাই, এই ২২২৫ সালে কে ২০২৫ মনে রাখে?"
একটা বিরাট নিঃশ্বাস ফেলে আব্দুর রহমান।
সে ধীরে ধীরে বলে, "তুই বুঝবি না, মান্নান। আমার ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠছে। একটা অদ্ভুত কম্পন। আমি যেন অতীত থেকে একটা ডাক শুনতে পাচ্ছি।"
মান্নান একটু চুপ করে থাকে, তারপর বলে, "চল, উঠে দাঁড়া। মাত্র ১০ মিনিট পরেই ২২২৬ সাল আমাদের গিলে ফেলবে।"
ঘড়িতে যখন রাত ১১টা ৫০ বাজে, তখন চারদিক ফেটে পড়ে শব্দে, আলোর ঝলকানিতে, কৃত্রিম আনন্দে।
ফ্লাইং ক্যামেরা, হলোগ্রাফিক স্ক্রিন, ডিজিটাল আতশবাজি - সব কিছু চিৎকার করছে: "২২২৫ ইতিহাস, ২২২৬ আমাদের হাতের মুঠোয়!"
কিন্তু আব্দুর রহমানের ভেতরে বেজে চলেছে এক প্রাচীন কণ্ঠ - আয় আমার কাছে আয়।
সবাই যখন গানে নাচে মাতোয়ারা, আব্দুর রহমান চুপচাপ চলে আসে শহরের প্রান্তে, সেই পুরাতন পাথরের দেয়ালঘেরা মসজিদের পাশে।
এটি নাকি ২১৫০ সালের আগেই বন্ধ হয়ে যায়।
এখন তা শুধুই স্মৃতির চিহ্ন।
সে মাটিতে বসে পড়ে। আকাশের দিকে তাকায়। তার চোখে জল জমে ওঠে।
"হে আমার রব, আমি বিশ্বাস করি তুমি আছো" সে ফিসফিস করে, "তুমি যদি এখনো কাউকে খুঁজে থাকো - এই ঘোলাটে সময়ে, এই ব্যর্থ ইতিহাসে - তাহলে আমাকে ডেকে নাও। আমি ভাঙতে চাই, সেই মুকুট... যেটা শুধুই সম্মান নয়, বরং অন্যায়ের প্রতীক।"
বাতাস স্তব্ধ হয়ে যায়।
দূরে কোথাও মাইক্রোফোনে গণনা চলছে - "Ten... Nine... Eight..."
আব্দুর রহমান হাত তুলে দোয়া করে। তার ঠোঁট কাঁপে - "তুমি শুধু মোরে লিখে নিয়ো।"
রাত পেরিয়ে গেছে। ২২২৬ সাল এসে গেছে।
তবু শহরের আকাশে কুয়াশা নেমে আছে।
মানুষ হাঁটছে, হাসছে, ব্যস্ত জীবন এগিয়ে চলেছে - কিন্তু আব্দুর রহমান ঠিক যেন সেই জীবনের স্রোতে নেই।
তার চোখে আজও ২০২৫ সাল আটকে আছে।
তার ভেতরে বাজছে সেই বাক্য, "তুইই পারলি, তুইই সেই বজ্রের প্রতিশ্রুতি..."
আজ সারাদিন সে কিছুই বলেনি।
ক্লাসে যায়নি, কফি খায়নি, কোনো স্ক্রিন ছুঁয়েও দেখেনি।
সে নিজের ঘরে বসে, একটা খাতা খুলে রেখেছে সামনে।
তাতে পুরনো অক্ষরে, হাতে লেখা কাব্যাংশ -
"আমি উপাড়ি ফেলিবো, আবারও সিংহাসন..."
এই কবিতা সে আগে কখনো লেখেনি।
তবু তার মনে হচ্ছে, এই লাইনগুলো কোনো এক প্রাচীন আত্মা লিখে গেছে তার মধ্যে।
সে শুধু এখন তার হাতের কলম দিয়ে তা প্রকাশ করছে।
আলতো করে কলম ধরে সে লিখতে থাকে -
"যদি মজলুম হয়ে থাকো প্রিয়
তবে হাতে হাত তুমি রাখো..."
দরজার বাইরে আব্দুল মান্নানের হাঁটার শব্দ।
কিছুক্ষণ পরে দরজা ঠেলে সে ঢুকে পড়ে।
"এই... এখনো কিছু খাসনি? কি ব্যাপার? আবার সেই কবিতা?"
আব্দুর রহমান মাথা তোলে না।
শুধু বলে, "তুই জানিস মান্নান, এই কবিতা আমি দেখি স্বপ্নে। আমি এর মানে খুঁজছি। এই শব্দগুলোর পেছনে যেন একটা ইতিহাস আছে, যা আমাদের 'এই সময়' তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। আমি সেটা ফিরিয়ে আনবো।"
মান্নান বসে পড়ে মেঝেতে।
বোতলের মুখে হাত রাখে, কিন্তু খোলে না।
আজ তার গলায় শব্দ নেই।
আব্দুর রহমানের কণ্ঠে আজ এমন কিছু আছে, যা শোনার পরে নেশা মরে যায়।
"তুই কি দিনে দিনে পাগল হয়ে যাচ্ছিস?" একটা চাপা প্রশ্ন করে সে।
আব্দুর রহমান হেসে ফেলে, "হয়ত তাই। কিন্তু এই শহরে যদি একজন পাগল হয়ে সত্য খোঁজে, তবে সেটাও একটা শপথ নয় কি?"
তার চোখে আলো জ্বলে ওঠে।
"আমি এই শহরের ভিতর দাঁড়িয়ে, একটা মুকুট ভেঙে ফেলতে চাই - যেটা শুধু সোনায় মোড়ানো নয়, জুলুমে গাঁথা। আর সেই ভাঙা মুকুটের পাশে আমি লিখে যাব - 'তুমি শুধু মোরে লিখে নিয়ো।'"
ঘরের দেয়ালে হালকা আলো পড়ে, খাতার ওপর কবিতার লাইন ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে।
ঘরের নীরবতা যেন সেই শব্দগুলো শুষে নিচ্ছে।
"আমি বজ্র হয়ে দাঁড়াবো পথে,
ভাঙিবো জুলুম জিও।
আমি রক্ত ঢেলে আঁকিবো ইতিহাস,
তুমি শুধু মোরে লিখে নিয়ো।"
ভোরের আলো এখনো আসেনি।
শহরের সব দিক নিস্তব্ধ, শুধু মাঝে মাঝে কোনো ভার্চুয়াল ট্রাফিক ড্রোনের শব্দ বাতাসে ছিন্নস্বরের মতো কেটে যায়।
ঘরের দরজায় একটি ডিভাইস থেকে ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে পড়ছে। তাতে এখনো ২২২৬ সাল শুরু হওয়ার কাউন্টডাউন চলছে - যদিও সময় পেরিয়ে গেছে একদিন আগেই।
আব্দুর রহমান সেই আলোর দিকে তাকিয়ে নেই।
সে শুয়ে আছে চুপচাপ, খালি চোখে ছাদের দিকে তাকিয়ে।
তার ঠোঁটে এখনো সেই স্বপ্নের পঙক্তি ভাসে, কিন্তু সে নিজেই জানে না - সেটা স্বপ্ন ছিল, নাকি অন্য কিছু।
"তুই আছড়ে ভেঙ্গে দিলি..." এই লাইনটা যেন বারবার ফিরে আসে কানে।
বিছানার পাশে রাখা একটা আধামরা ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যেটা দিয়ে সে আগের রাতে মদ অর্ডার করেছিল, এখনো অন চলছে।
তাতে "সন্তুষ্টি রেটিং দিন" লেখা ঝলকাচ্ছে।
আব্দুল মান্নান আবারো ফিরে আসে ঘরে।
এইবার তার হাতে দুটো স্টিম কফি কাপ।
"আর যাই হোক কফি না খেলে তো এই ক্যালেন্ডার চলেনা," বলতে বলতে সে কাপটা টেবিলের ওপর রাখে।
আব্দুর রহমান উঠে বসে, মুখে এখনো একধরনের ঝিমুনি।
"ঘুম আসে না মান্নান। মাথাটা কেমন করছে।"
"আরে ভাই, ঘুম আসবে কেন? তুই যেই বকবক করছিলি রাতভর, তারপর হঠাৎ করেই 'আমি উপাড়ি ফেলিবো!' বলে চিৎকার করে উঠলি - তুই তো কবি হইয়া গেছিস দেখি!"
আব্দুর রহমান ফ্যাকাসে হেসে ফেলে। "আমি বুঝি না, এরকম স্বপ্ন কেন আসলো। আর এত স্পষ্ট কিভাবে হতে পারে? আমার তো মনে হচ্ছে... আমি ওখানে ছিলাম। সেই সময়ে। সেই মুকুটের সামনে।"
"তুই অনেক দিন ধরে লাইনে নেই, এইটাই আসল ব্যাপার।" মান্নান চুমুক দেয়।
"তুই বলেছিস, তুই একদিন পীরের দরগায় গেছিলি, তাই না?" আব্দুর রহমান হঠাৎ জিজ্ঞেস করে।
"হ্যাঁ, একবার। ছোট ছিলাম তখন। এক বুড়ো বলছিল - তোরা ইতিহাসের সন্তান। আমি ভেবেছিলাম, কেউ বইয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখছে আমাকে।"
আব্দুর রহমান চুপ করে যায়।
তার মাথার মধ্যে কিছু একটা আটকে গেছে।
"মান্নান, তুই কখনো কুরআনের কোনো আয়াত পড়ছিস যেটা কেমন করে যেন কানে আটকে যায়?" সে নিচু গলায় বলে।
মান্নান কাঁধ ঝাঁকে।
"না রে। আমার ধার্মিক আত্মীয়রা তো কেবল মাইর দিত। তাদের ধর্ম মানেই ছুটি বা ছুরি। তবে আমি একবার একটা ছেলেকে বলতে শুনেছিলাম - সে একদম শান্ত গলায় একটা আয়াত বলছিল। ('وَقِفُوهُمْ ۖ إِنَّهُم مَّسْئُولُونَ') আয়াতটা মুখস্থ নেই অর্থও মনে নেই, বলতে শুনেছি সূরা নম্বর ৩৭, আয়াত নম্বর ২৪ । তবে কেমন যেন গা শিউরে উঠেছিল।"
আব্দুর রহমান চুপ হয়ে যায়।
তার মাথায় এখন ভেসে ওঠে স্বপ্নের সেই দৃশ্য।
মুকুট। পত্রিকা। সেই চুলওয়ালা মানুষ - যার চোখে পানি।
সে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়।
"মান্নান, আমি বের হচ্ছি। একটু হাঁটতে হবে।"
"এত ভোরে কই যাবি?"
"আমি জানি না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে... এই শহরের কোনো দেয়ালে, কোনো ভাঙা ইটের ফাঁকে... স্বপ্নটার মানে লুকিয়ে আছে। আমি... আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কিন্তু এইটা স্বপ্ন না। এটা কিছু একটা ছিল। ভিতরের কিছু নাড়িয়ে দিচ্ছে আমাকে। যেনো আমাকে উন্মাদ করে দিচ্ছে। আ,, আ,, আমি পাগল হয়ে যাব।"
মান্নান এবার উঠে দাঁড়ায়।
তার কণ্ঠে বিরক্তি, কিন্তু ভেতরে চিন্তা।
"তুই আবার 'সত্য' খুঁজতে যাচ্ছিস না তো? এই শহরে সত্য বলে কিছু নাই। সবকিছুই ডেটা আর ডিজাইন। তোর মাথাটা একটু ছুটছে রে ভাই।"
আব্দুর রহমান দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়।
শহরের বাতাসে কুয়াশা, নিঃশব্দতা আর বিদ্যুতের আলো।
সে হাঁটে, চোখে বাঁচার ইচ্ছে নেই - কিন্তু ভেতরে কোথাও এক অসমাপ্ত প্রশ্ন গুনগুন করছে, যা রাতের কবিতার মতোই তাকে ঘিরে ফেলেছে।
একটা পুরনো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সে দেখে এক বৃদ্ধ মানুষ একটি দেওয়ালে কিছু লিখে চলে গেলেন - ফ্যাকাসে চকের দাগে, খুব ছোট করে: "তুমি যদি সত্য চাও, তবে সাহস রেখো।"
আব্দুর রহমান চমকে যায়।
কোনো কারণ ছাড়াই তার বুকের ভেতর কাঁপুনি ধরে যায়।
সে ধীরে ধীরে ওই লেখার ওপর হাত রাখে।
"আমি বজ্র হয়ে দাঁড়াবো পথে..." অজান্তেই ঠোঁটে সেই বাক্য ফিরে আসে।
সে থমকে যায়।
"না। এখন না। আমি এখনো প্রস্তুত না। আমি এখনো খুব দূরে আছি।"
তার চোখে জল চলে আসে।
"কে আমি? আর কেনো এসব ঘটছে..."

পর্ব ২

শহরের নাম নিও-জেডা।
২০২৫ সালের দিকে এখানে একটা ঐতিহাসিক শহর ছিল, যা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল বলে লোকমুখে শোনা যায়।
তবে তা এখন শুধুই প্রযুক্তির ফাইলের ভেতর বন্ধ এক স্মৃতির ফোল্ডার।
নিও-জেডা এখন এক ডিজিটাল নগরী - ২২২৫ সালে এসে যেখানে রাত আর দিন আলাদা করা যায় না।
যেখানে সূর্য ওঠে কৃত্রিমভাবে, বৃষ্টিও আসে অনুরোধে।
মানুষের দেহে 'এথার-ট্যাগ' বসানো, চিন্তা নিয়ন্ত্রণযোগ্য, ধর্ম "একটা আবেগগত ব্যাকডেটেড ফাংশন" হিসেবে সংজ্ঞায়িত।
বিলবোর্ডে বড় বড় হরফে লেখা - "Truth is Choice. The choice is yours. You are Free."
নিও-জেডায় এখনো কিছু মসজিদের অবকাঠামো রয়ে গেছে, কিন্তু সেখানে আর নামাজ হয় না।
বেশিরভাগই মিউজিয়ামে রূপান্তরিত, কিছু ক্যাফে বা সেমিনার হলে রূপান্তরিত হয়েছে।
নাগরিকদের বিশ্বাসভিত্তিক পরিচয় এখন আইনি মান্যতা পায় না।
ধর্মীয় পোশাক, চিহ্ন - এসব কেবল "পার্সোনাল ডিজাইন" নামে বিবেচিত।
যদি কেউ রাস্তায় বলে, "আল্লাহু আকবার", সাথে সাথেই তাকে 'সাইকলজিক্যাল ফ্রেমিং ইউনিটে' নিয়ে যাওয়া হয় - যেখানে তার চিন্তাচেতনা পরিমার্জনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
শহরের কিছু মুখ
অ্যাভা রিন।
একজন "আলোকিত কনটেন্ট থেরাপিস্ট"।
তার কাজ - যারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তাদের বলার চেষ্টা করা যে তারা ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে কেবল দুঃখের কারণে।
সে স্যোশ্যাল সেন্টারে আসে মাঝে মাঝে বক্তৃতা দিতে - "Don't heal through prayer - heal through presence." "God is a patch file - obsolete. You are your own upgrade."
কিউবি-৫।
এটি একটি AI মানব রোবট।
এটি "মরাল অ্যাডভাইজর" হিসাবে কাজ করে।
যে কেউ কিছু বললেই সে বিশ্লেষণ করে জানায় সেটি "লজিক্যাল" না "এমোশনালি বাইয়াসড"।
ধর্মীয় কোনো কথা বললেই বলে: "ডাটা সাপোর্ট করে না। আপনার অনুভব ভিত্তিহীন।"
ড্যান টেম্পার।
একজন প্রচণ্ড প্রভাবশালী নাস্তিক বক্তা ও "ফ্রি-হিউম্যানিটিস্ট"।
তাঁর আন্দোলনের নাম "ঈশ্বরমুক্ত সভ্যতা"।
তিনি বলেন - "The God-idea was the final software glitch. Now, we live in the real."
আব্দুর রহমান ও আব্দুল মান্নান
মান্নান এই শহরের ছেলের মতোই বেড়ে উঠেছে।
মা নামাজ পড়তেন না, বাবা কুরআন শেলফে রেখে দেননি - ডিলিট করে ফেলেছিলেন।
স্কুলে পড়ানো হয় - "Religious Identity is a Psychological Error."
তবে একবার ছোটবেলায়, মান্নান এক মাদরাসার ধ্বংসাবশেষে গিয়ে দেখেছিল একজন বৃদ্ধ শুয়ে আছেন, চোখে ছিল অদ্ভুত এক শান্তি।
বৃদ্ধ বলেছিলেন, "তুমি জানো, মেঘ শব্দ করে না - আল্লাহর হুকুমে বজ্র গর্জায়।"
মান্নান বুঝেনি, তবু সেদিন ঘরে এসে চুপ করে ছিল অনেকক্ষণ।
আব্দুর রহমানের গল্প আলাদা।
তার বাবার নাম ছিল মাওলানা ফারুক আলী।
এক সময় তিনি শহরের একমাত্র কার্যকরী মসজিদের ইমাম ছিলেন, পরে একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান।
কেউ বলে, তাকে 'রিফর্ম সেন্টারে' নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
আব্দুর রহমান তখন ছোট।
তার মনে শুধু ভাসে সেই একটি বাক্য - "তুমি যদি সত্য চাও প্রিয়, তবে সাহসী হইও।"
এখন তারা দুজন - মান্নান আর রহমান - নিও-জেডার রাস্তা ধরে হাঁটে, হাসে, মদ খায়, লেট নাইট পার্টিতে যায়।
কিন্তু একটাই পার্থক্য: মান্নান ভুলে গেছে, আর আব্দুর রহমান ভুলে যেতে পারছে না।
রাতে যখন তারা ক্যাফে "নিউ এডেন"-এ বসে, তাদের টেবিলে অ্যাভা রিন আসে।
"তোমার চোখ বলছে তুমি খুঁজছো," সে বলে, "কিন্তু তুমি বুঝতে পারছো না, তুমি যা খুঁজছো - তা আসলে একধরনের মায়া।"
আব্দুর রহমান তাকিয়ে থাকে চুপচাপ।
"তুমি কি কোনো ঈশ্বর বিশ্বাস করো?" অ্যাভা জিজ্ঞেস করে।
"আমি জানি না," সে বলে, "তবে আমি মনে করি - স্বপ্ন এমন জিনিস নয় যেটা কেবল মস্তিষ্ক তৈরি করে। কিছু কিছু স্বপ্ন... ডাকে।"
অ্যাভা হেসে ফেলে।
"তোমাকে 'ড্রিম টেক থেরাপি' নিতে হবে। নাহলে তুমি খুব শীঘ্রই 'রিলিজিয়াস প্যারানোইয়া'-তে আক্রান্ত হবে।"
এই শহরের আলো ঝলমলে রাস্তা ধরে আব্দুর রহমান হেঁটে চলে।
তাকে কেউ থামায় না, কেউ ঘৃণা করে না, কেউ ভালোবাসেও না।
শুধু মাঝে মাঝে সে দেখে একটি দেয়ালের ফাঁকে লেখা ছোট্ট একটা বাক্য - "প্রথম বজ্র নামবে ভেতরের আকাশে। প্রস্তুত হও।"
সেই দেয়ালের লেখাটা দেখে আব্দুর রহমান কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
"প্রথম বজ্র নামবে ভেতরের আকাশে। প্রস্তুত হও।"
বাক্যটা কেমন করে যেন হৃদয়ে ঢুকে যায়, যেন এটি কেউ তার জন্যই লিখে রেখে গেছে।
তার হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেয়ালের ফাঁকা অংশে উঠে যায়।
আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে লিখে ফেলে - "আমি প্রস্তুত না, কিন্তু আমি পালাব না।"
হঠাৎ তার পিছনে আওয়াজ।
"দেখলাম... তুমি ছুঁয়েছিলে লেখাটা।"
কণ্ঠস্বর কোমল, কিন্তু দৃঢ়।
চোখে চশমা, দাড়ি আছে - পরিচ্ছন্ন।
মাথায় কোনো টুপি নেই, গায়ে ছেঁড়া হুডি।
তার নাম মুনির।
"আমি এই শহরের এক ঘরবসতি," মুনির বলে। "বাতিল যত উঁচু হোক, আমি নিচে বসে থাকি। তবে আমি জানি, একদিন সত্য গর্জে উঠবে।"
আব্দুর রহমান কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়।
মুনির তার দিকে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে, "তুমি কি কুরআনের কথা এখনো শুনতে পাও?"
রহমান আঁতকে ওঠে।
"তুমি... তুমি জানো?"
"না। আমি জানি না, কিন্তু আমি বুঝি - এই শহরে কেউ যদি হঠাৎ জেগে ওঠে, তবে সে নিশ্চয় কোনো চিহ্ন বহন করে।"
মুনির রহমানকে নিয়ে যায় শহরের বাইরে এক পুরনো টানেলের ভেতর দিয়ে।
সেখানে কিছু লোক মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আছে, কেউ হাতে লেখা পাতায় পড়ছে কিছু, কেউ ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের শেখাচ্ছে আরবি বর্ণমালা।
এটা কোনো আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্র নয়। না কোনো মসজিদ। না কোনো লাইব্রেরি।
এটি যেন হারানো যুগের স্মৃতির গুহা - নাম "আস-সিরাত"।
একজন বৃদ্ধ সেখানে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন।
তার নাম শাইখ খালিদ আল-মাহদি।
এককালে তিনি ছিলেন নিউ-জেডা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিকতা বিভাগে প্রফেসর।
একদিন 'আল্লাহ' শব্দ উচ্চারণ করায় তাকে পদচ্যুত করা হয়।
তিনি বলেন, "তোমরা যারা এখনো চোখ মেলে তাকাও, তোমরা বিজয় আনতে এসো না - তোমরা বিশ্বাসের গাছ বপন করতে এসো। তোমরা বজ্র হয়ে এসো না - তোমরা প্রথম নীরব ধ্বনি, যা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।"
আব্দুর রহমান বসে পড়ে মাটিতে।
তার চোখে জল জমে ওঠে।
কেউ তার মাথার ওপর হাত রাখে।
এতদিন পর - প্রথমবার।
শাইখ খালিদ তাকে জিজ্ঞেস করেন, "শুনলাম তোমার ব্যাপারে। স্বপ্নে তুমি কী দেখেছিলে, পুত্র?"
আব্দুর রহমান ধীরে ধীরে বলে, "একটা মুকুট... আমি সেটা ভেঙে ফেলেছিলাম... আর কেউ একজন বলছিল - তুইই সেই বজ্রের প্রতিশ্রুতি..."
শাইখ হেসে ফেলেন। "সুবহানাল্লাহ... তুমি জানো, আল্লাহ যখন কাউকে আহ্বান করেন, তিনি আগে স্বপ্ন দেখান, তারপর ধাক্কা দেন। এখন শুরু হয়েছে তোমার দ্বিতীয় অধ্যায়।"
ফিরে আসার পর, আব্দুর রহমান ছাদের উপর দাঁড়িয়ে।
নিচে শহর তার নিজস্ব গতিতে চলছে - নিয়ন আলো, নেশাগ্রস্ত গলি, নষ্ট ভাবনা।
তার পাশে দাঁড়ায় মান্নান।
"তুই কোথায় ছিলি আজ?" জিজ্ঞেস করে।
"একটা পুরনো টানেলে," রহমান উত্তর দেয়। "সেখানে এখনো মানুষ লিখে রাখে: যদি সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে প্রিয়, তবে দ্বীপ হয়ে তুমি জ্বলো।"
মান্নান ফিসফিস করে, "এই লাইনটা কোথা থেকে পাইছিস তুই?"
"এটা আমার মধ্যেই বাজে, বারবার। তুই কি বলবি আমি পাগল?"
"পাগল তো আমরা সবাই... কেউ বোতলে, কেউ শব্দে, কেউ মুছে ফেলা অতীতে।"
দুই বন্ধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
আকাশে কিছু উড়ে যায় - কৃত্রিম ড্রোন, অথবা... কোনো চিহ্ন।
তারা জানে না। কিন্তু রহমানের বুকের ভেতর প্রথম বজ্রটা যেন নিঃশব্দে কাঁপে।
নিও-জেডার নাইট লাইফ - এটা ধর্মহীন জীবনের এক নতুন আয়নায় দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবী।
যেখানে আলো আছে, কিন্তু হিদায়াত নেই।
শব্দ আছে, কিন্তু সিজদা নেই।
চোখ আছে, কিন্তু আল্লাহর দিকে তাকানোর দৃষ্টিশক্তি নেই।
সেই রাত - একটা মেটা-জেম ক্লাবে, আব্দুর রহমান ঢুকল বন্ধুদের সাথে।
তার চোখ লাল নয়, মন লাল।
আলো ঝলমলে।
চারদিকে মানুষ - হাসছে, নাচছে, কেউ ফ্লোরে পড়ে যাচ্ছে, কেউ নিজের শরীর বেচে আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে।
কৃত্রিম পারফিউম আর মিথ্যা সম্পর্কের গন্ধ বাতাসে মিশে গেছে।
মান্নান তার পাশে, আরও দুই বন্ধু - রেমো: একজন রোবো-গেমার, যার মতে "নিখুঁত প্রেম হলো AI'র সাথে সম্পর্ক।" সাশা: এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর, যিনি তাঁর অনলাইন ফলোয়ার বাড়াতে প্রতিদিন নিজের মূল্যবোধ বদলান।
রেমো বলল, "রহমান ভাই, তুমি কি কবি হয়েছ? আজও কি 'মুকুট ভাঙা'র গল্প করবা নাকি একটু ফান করবা?"
সাশা হেসে বলল, "তুমি এখন ইনফ্লুয়েন্সড। ডিটক্স দরকার তোমার। তোমার ব্রেইনে কেউ ইমোশনাল ভাইরাস ইনজেক্ট করছে।"
আব্দুর রহমান চুপচাপ একটা বোতল হাতে নেয়, চোখে বিষণ্নতা, ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি।
সে জানে না সে কেন এসেছিল এখানে।
তবে সে জানে, এই শহর তাকে জন্ম দিয়েছে - এখানকার গন্ধ, ছায়া, স্পর্শ - সবই তার পরিচিত।
রাতের কোনো এক সময়ে, সে নিজেকে খুঁজে পায় বাথরুমের আয়নার সামনে।
চোখের নিচে ক্লান্তি, গালে একফোঁটা ঘাম, আর ঠোঁটে নিজের প্রতিচ্ছবির সাথে বিতর্ক।
সে ফিসফিস করে বলে - "আমি কি বদলাচ্ছি? নাকি শুধু অভিনয় করছি?" "স্বপ্নের ডাক কি বাস্তব?" "তাহলে এখন কেন আমি এখানে? আবার এই নেশার ভেতরে কেন?" "তুমি কি আমায় ডাক দিচ্ছো, হে আমার রব? তবে আমি তো এখনো নোংরা, এখনো এই কুয়াশার শহরের সন্তান..."
হঠাৎ ক্লাবের বাইরে বিস্ফোরণের শব্দ।
মানুষ ছুটছে, কেউ কেউ চিৎকার করছে।
কিছুক্ষণ পর জানা যায় - এক যুবক নিজের বুকে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।
কেউ বলে: "ও মুসলিম ছিল।"
আর কেউ বলে: "ও হতাশ ছিল। পিতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে এসেছিল কারণ, হয়তোবা খুনিরা এখানে ছিল।"
কিন্তু অধিকাংশরাই বলে: "ও পাগল ছিল।"
রহমান বেরিয়ে আসে ক্লাব থেকে।
বৃষ্টির মতো কৃত্রিম জল পড়ছে।
তার চোখের নিচে চেপে বসে কিছু একটা - না অপরাধবোধ, না অস্বস্তি - বরং এক অদ্ভুত অনাহুত জাগরণ।
তিন দিন পর, সে আবার আস-সিরাত -এ যায়।
তবে এইবার তার মুখে কবিতা নেই।
এইবার তার মুখে কেবল একটা প্রশ্ন: "আমি কি পবিত্র হতে পারি, যখন আমার অভ্যাস এখনো নোংরা?"
শাইখ খালিদ মাথা নিচু করে বলেন, "পবিত্রতা কোনো গঠনের নাম না, এটা সেই যুদ্ধ - যেখানে তুমি প্রতিদিন তোমার নাফসকে হারাও, আবার দাঁড়াও। তুমি যখন দোয়া করো - 'আল্লাহ, আমাকে পথ দেখাও' - তুমি তখনই পবিত্র হয়ে যাচ্ছো, যদিও তুমি তখনো ক্লাবে যাও, মদ ছোও, কিংবা গুনাহ করো। তুমি তখনো পবিত্র - কারণ তুমি লজ্জিত।"
মাঝরাতে রহমান একা হাঁটে।
সে রাস্তা ধরে হাঁটে - মাথা নিচু করে।
তার কানে বাজে এক ভেতরের কণ্ঠ, যা বলে -
"যদি সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে প্রিয়
তবে দ্বীপ হয়ে তুমি জ্বলো
আমি তুফান ঠেলে আনিবো সকাল..."
এইবার সে জানে, এই কণ্ঠ তার নয় - এই কণ্ঠ আল্লাহর একটি গোপন উপহার।
সে থেমে দাঁড়ায়।
এক বৃদ্ধ হকার রাস্তার ধারে শুকনো খেজুর বিক্রি করছে।
রহমান প্রশ্ন করে, "চাচা, এই শহরে ঈমান বাঁচানো কি সম্ভব?"
বৃদ্ধ মাথা তোলে।
তার চোখে জল, ঠোঁটে কম্পন।
সে উত্তর দেয় - "জ্বলন্ত শহরে পানি হয়ত কম, কিন্তু অশ্রু? - ওজুটা না হয় এই দিয়েই হোক।"
রহমান থমকে যায়।
তার চোখের কোণ ভিজে যায়।
সে জানে না, এই অশ্রু পাপের, না তাওবার।
তবে সে শুধু জানে - এই রাতের ভিতরে একটা ফজর অপেক্ষা করছে।
নাস্তিকতার সভ্যতা
নিও-জেডার গগনচুম্বী টাওয়ারগুলো আজকের সভ্যতার প্রতীক, যেখানে মানুষের বিশ্বাসের ভেতর এক সঙ্কীর্ণ সিস্টেম কাজ করে - অর্থাৎ, বিশ্বাস হলো অসদর্থক জিনিস, যা প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
এই নগরের শীর্ষ পাড়ায় বসবাস করে "নেভি" এবং তার সঙ্গীরা - যারা বিশ্বাস করে, "মানুষের অগ্রগতি সম্পূর্ণ নির্ভর করে বিজ্ঞানের উপর। ঈমান হলো অন্ধকার যুগের কণা। এখন আমরা ডেটা, অ্যালগরিদম আর রোবটের বিশ্ববাসী।"
নেভি একজন কর্পোরেট সিইও।
তার চামড়া চকচকে, চেহারা ঝকঝকে, কিন্তু চোখে এক গাঢ় শূন্যতা।
তার জন্য ধর্ম মানে "মস্তিষ্কের বিকৃতি"।
তিনি বলেন, "আমাদের সভ্যতা আর প্রাচীন অলঙ্ঘনীয় নীতিমালা মেনে চলবে না। আমরা নতুন আইন গড়ব - যেখানে শুধুমাত্র বুদ্ধি ও প্রযুক্তি শাসন করবে।"
নেভির দলের বেশিরভাগই উচ্চশিক্ষিত, তবে তাদের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান অথবা ভাবনার কোনো পরিচয় নেই।
তারা মানুষের আবেগকে দুর্বলতা মনে করে।
যারা এখনও বিশ্বাসের পথে হাঁটে, তাদের 'মনস্তাত্ত্বিক রোগী' বা 'সামাজিক বিপদ' হিসেবে চিহ্নিত করে হাই-টেক মনিটরিং সিস্টেমে ফেলে দেয়।
নেভির দল নিয়ন্ত্রণ করে - শিক্ষা: স্কুল-কলেজে ধর্মীয় শিক্ষা বন্ধ, "মানবিকতা" শিক্ষাও শুধুমাত্র সাইকোলজিক্যাল কোডে বাঁধা। মিডিয়া: সব ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিষয়ের প্রচার নিষিদ্ধ, পরিবর্তে প্রচারিত হয় সাইবার ফেস্টিভ্যাল, গেমিং, এবং AI ডেটা রিলিজ। আইনি ব্যবস্থা: ধর্মীয় উক্তি দিলে কঠোর শাস্তি, আর যাদের বিশ্বাস আছে তারা 'আন্তর্জাতিক সাইবার সিকিউরিটি আইনে' কাঠগড়ায় তোলা হয়।
নেভির সঙ্গীরা
কিরা ব্লেক।
একজন প্রভাবশালী ইউটিউবার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, যার মূল থিম - "সত্য হলো নিজেকে মুক্ত করা, ঈশ্বরের বন্ধন ছিন্ন করা।"
কিরা লাইভে বলে, "আমি নিজেকে আবিষ্কার করেছি যখন ঈমান থেকে মুক্ত হলাম। তোমাদেরকে বলতে চাই, আল্লাহর নাম না নিয়ে জীবনের আনন্দ পাও।"
তার ভক্তরা যুবক-যুবতী, যারা আজকের সমাজের অনিশ্চয়তায় ভেসে বেড়ায়।
তারা কিরার কথায় জড়ায়, যেখানে তারা পায় 'স্বাধীনতার' গন্ধ।
লুকাস মর্গ্যান।
একজন প্রখ্যাত AI গবেষক, যিনি বলেন, "মানবতার পরবর্তী পর্যায় হলো 'বুদ্ধিমত্তার বিকাশ'। ধর্ম এবং ঈশ্বর কেবল মানসিক প্রতিবন্ধকতা।"
তার গবেষণায় দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক যন্ত্র, যা মানুষের চিন্তা ও অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
সে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধর্মীয় মানুষের 'মনস্ক্রিপ্ট' বদলাতে চায়।
এই আধুনিকতার ছায়ায়,
নিও-জেডার নিম্নশ্রেণীর মুসলিমেরা ভয়ংকর এক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
তারা ঘরে ছোটবেলায় নামাজ দেখেনি,
স্কুলে কুরআন শেখানো হয়নি,
তাদের ইমান ভেঙে পড়েছে।
তারা কখনোই উচ্চ শিক্ষায় আসতে পারেনি,
কোনো স্থানীয় সমাজে সম্মান পায় না।
ধর্মীয় বই রাখা মানে ‘আসামি’ হওয়া।
তাদের কাছে ধর্ম মানে এক দুর্বলতার প্রতীক, যা হাসির পাত্র।
কেউ কেউ মনে করে, “আমরা তো এই শহরের সন্তান,
ঈমানের পাপ আমাদের পিছু ছাড়েনা, কিন্তু প্রযুক্তি-সমাজ আমাদেরই শাসন করে।" তাদের জীবন জুড়ে আছে দুটি জিনিস:
অসীম হতাশা আর অবজ্ঞা।
মান্নান সেই সমাজেরই একটি বৃত্তান্ত।
মুসলিম পরিবারের ছেলে হলেও, তার ঘর ছেয়ে গেছে অবিশ্বাস আর উদাসীনতার আবহে।
সে নেশার স্রোতে ভাসে। কারণ সে জানে না অন্য কোনো পথ।
তার কাছে ঈমান কেবল এক ‘অবাঞ্ছিত আবেগ’।
সে বোঝে না মা-বাবার আদর্শ কেবল মুখোশ।
একদিন সে হেসে বলেছিল,
“রহমান, ঈমান মানে কি?
আমার কাছে এটা হলো একটা বোঝা।
তার হাসিটা তিক্ত, চোখে কোনো জল নেই।
সে আসলে জানে,
নিজেকে বিশ্বাস না করা মানে, নিজেকেই হারানো।
রহমান এই দুই জগতের মধ্যে আটকে পড়েছে।
একদিকে বাবার কুরআনের আলো,
অন্যদিকে মান্নানের অন্ধকার নেশা।
তাকে বারবার টেনে নিচ্ছে এই শহরের নিষ্ঠুর ছন্দ,
কিন্তু ভেতর থেকে সে চিৎকার করছে,
“আমি অন্যরকম হবো।”
তবে সেই ‘অন্যরকম হওয়া’ কোনো মিষ্টি স্বপ্ন নয়,
এটা এক ঝড়ের মধ্যে পাথর ছুঁড়ে ফেলা
এবং সেই ঝড় থেকে বাঁচার নামই হলো বজ্রের শপথ।

পর্ব ৩

২২০০ সাল।
মাওলানা ফারুক আলী। যিনি ছিলেন এক সময়ের অন্ধকারের মশাল। নিও-জেডার বিস্তীর্ণ, উঁচু শহরের এক ছোট্ট এলাকা যেখানে সবই ডিজিটাল, তবুও কিছু মানুষ ছিল যারা পুরনো ঐতিহ্যের সাথে বেঁচে থাকার চেষ্টা করত। ফারুক আলী ছিলেন তাদের একজন।
সে ছিল একজন ইমাম।
তার দোয়া ছিল মানসিক শান্তির খোঁজে,
তার ভাষণ ছিল একটি হারানো পৃথিবীর বার্তা -
যেখানে ঈমান ছিল জীবনের মূল,
নাজাতের একমাত্র সেতু।
কিন্তু সেই শহরে তার কথা গোঁড়া বিশ্বাস বলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া হতো।
নতুন যুগের মানুষ তাকে দেখতো এক প্রাচীন যন্ত্রের মতো, যা কোনোদিন আপডেট হয়নি।
একদিন, শহরের আধুনিক ইউনিট থেকে একজন কর্মকর্তা এসে মসজিদের দরজায় উদয় হলো।
তার কথা ছিল - "মাওলানা ফারুক, আপনার এই পুরনো বিশ্বাস আজকের জেনারেশনের জন্য বিপদজনক। আপনাকে বদলাতে হবে। আমরা প্রযুক্তি-সমাজে অগ্রসর হচ্ছি, আর আপনার মতোরা পিছিয়ে পড়ছে। আপনি কি বুঝতে পারেন না, আপনার কথা মানুষের মস্তিষ্কে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে?"
ফারুক আলী চুপ করে ছিল।
কিন্তু তার চোখে ছিল এক অদম্য আগুন।
সে জানত, সে হারাচ্ছে তার বাড়ি, তার মানুষ, তার সময়।
শহরের একান্ত অন্ধকার কোণে, একটি ছোট সেল।
কাঁচের দেয়াল নেই, শুধু ধাতব গ্রিলের ফাঁকে ফাঁকে এসে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস শরীর ছুঁয়ে যায়।
মাওলানা ফারুক আলী সেদিন বন্দী।
তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল 'অপরাধী' হিসেবে, অপরাধ ছিল শুধু ঈমানের কথা বলা।
তার চোখে তখনো ছিল বিশ্বাসের দীপ, কিন্তু শরীরের ব্যথা আর শারীরিক নির্যাতন তাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছিল।
মাওলানা ফারুক আলীর বন্দিত্বের খবর শুনে শহরের মুসলিম সম্প্রদায় ভীষণ কাঁপছে।
কিন্তু শক্তিশালী আধুনিকতাবাদীরা চুপ করে থাকল - কারণ তারা জানে, এই 'অন্ধকারের মানুষটি' তাদের আধিপত্যের বাধা।
সেদিন রাতে, ফারুক আলীকে একটি অজানা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় - যেখানে তার নিপীড়নের পর সীমাহীন নীরবতা এসে পড়ল।
তার নামে সব সরকারি নথিপত্র মুছে ফেলা হলো।
তাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার সেই প্রথম পদক্ষেপ।
তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হলো।
দক্ষিণ-পূর্বাকাশে কালো মেঘের পাহাড় যেন ভেঙে পড়ছে এমন - বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া পাগলের মত তাণ্ডব চালাচ্ছে। বিদ্যুৎ চমকিয়ে ধরা নীরব। একটি কোমল সুরে কোত্থেকে জানি ভেসে আসছে কান্নার আওয়াজ।
মা, নবজাতকের আর্তনাদে নতুন জীবনের শুরু নিশ্চিত করল। তীব্র কান্নার আওয়াজে যেন পৃথিবীকে জানিয়ে দিলো - তার অস্তিত্বের প্রমাণ।
এক দিকে ফারুক আলীর চ্যাপ্টার ক্লোজ, অন্যদিকে - নিও-জেডার অন্ধকার আকাশের নীচে, শহর আর শহর, টাওয়ার আর টাওয়ার একাকার।
কিন্তু সেই আধুনিকতার অতলে, একটি ছোট্ট ঘর ছিল - জানালা মেলে থাকা, কিন্তু অন্ধকারে ঢাকা।
সেই ঘরে, নবজাতক আব্দুর রহমান ছিল নিঃসঙ্গ।
মা ছিল ক্লান্ত, তরুণ বালক ছিল একাকী, তার বাবা ফারুক আলী তখনও নিপীড়নের সেল থেকে মুক্তি পাননি।
শৈশব থেকেই তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত দৃষ্টি - যা দেখে সে, শুধু আধুনিকতার জ্বলজ্বলানি নয়, এক গভীর একাকিত্বের বেদনা।
রহমান যখন হাঁটতে শিখল, তার চারপাশে ছিল খামখেয়ালী আলো আর বিকৃত শব্দ।
শহরের মানুষ তাকে 'বিশ্বাসী বাচ্চা' বলত, কিন্তু সে জানত না কেন।
তার বাবা ছিল মৃত, মা একাকী, আর সে এক বিচ্ছিন্ন প্রাণ।
তবে সে ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসত গল্প।
দাদী তাকে গল্প বলত - কিভাবে বজ্র ঝড় আসবে, কিভাবে একদিন মানুষ বদলাবে।
একদিন, স্কুলে প্রথমবার "মুক্ত চিন্তা" ক্লাসে গেলো, সেখানে সে দেখল - শিক্ষক বলছে, "ধর্ম হলো কুসংস্কার, তোমাদের মুক্তি দরকার।"
সেই দিন থেকে তার মুখে প্রশ্নের এক নতুন সুর বাজতে শুরু করল।
"আমি কি ভুল বিশ্বাসে বাঁচছি? আমি কি একাকী?"
শহরের হাই-টেক গলি ও ক্লাবে সে হারাত সেলফি আর ফ্রেন্ডসের ভিড়ে।
তবে কোথাও তার হৃদয় শান্ত হতো না।
একবার তার হাতে পড়েছিল ফারুক আলীর পুরনো কবিতা, যেখানে লেখা ছিল, "আমি বজ্র হয়ে দাঁড়াবো পথে, ভাঙিবো জুলুম জিও..."
সেই লাইনগুলো মনে পড়লে তার বুক দোলে - কিন্তু মুখে আসে না।
আজও সে বুঝতে পারে না, এই শহর তার পিতাকে মুছে ফেলেছে - তবে সেই নিভৃত আলোর মতো, তার অন্তরে এখনো জ্বলে এক ঝলমল করে ওঠা বজ্র।
রহমান বড় হচ্ছিলো এক অদ্ভুত সময়ে, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের সব ইচ্ছা পূরণ করলেও, তার নিজের মন যেন হারিয়ে যেত নিঃসঙ্গতার গভীরে।
স্কুলের ক্লাসরুমে সে অনুভব করত, তার ভাবনার গণ্ডি ছোট, তাকে বলা হত 'অসামাজিক' কারণ সে ধর্মীয় প্রশ্ন করত, আর অন্যরা হাসত।
একদিন, যখন সকালের সূর্য আকাশের আড়ালে লুকিয়ে ছিলো, সেই ছোট্ট ছেলে গোপনে মসজিদের দরজায় গিয়েছিল, যেখানে সে এক বৃদ্ধের কাছে শুনেছিল পিতা ফারুক আলীর বাণী - "তুমি আলোর জন্য পাঠিয়েছো, অন্ধকারের মধ্যে।"
একবার, সে তার মায়ের কাছে গোপনে জানতে চেয়েছিল, "আমার বাবা কোথায়? সে কি সত্যিই মারা গেছেন?"
মা শুধু চোখ বুলিয়ে বলেছিল, "তোমার বাবার আত্মা আমাদের সাথে।"
তার ছোট হৃদয় সেই প্রশ্ন আর উত্তর নিয়ে কাঁপত, তবু সে হাল ছাড়েনি।
রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে যেত, রহমান ছোটখাটো কাগজে লিখত কবিতা, কবিতায় আঁকত সে বজ্রঝড়ের ছবি - যেখানে বেদনার আকাশে আলো ঝলমল করত।
কিন্তু সেই আবেগ গোপনে রাখত, কারণ শহরের দুনিয়া ছিল নির্মম - এখানে 'বিশ্বাস' মানে দুর্বলতার প্রতীক।
বছর কেটে গেল, তার দেহ বড় হলো, কিন্তু ভিতরে লুকানো এক মনের যুদ্ধ ছিল তীব্র।
তার চারপাশের মানুষের চোখে সে ছিল 'অসামাজিক' এবং 'পুরানো ছাপ'।
তার ঘুম থাকে অশান্ত, স্বপ্ন আসে বার বার - সেখানে থাকে বাবার ভেসে আসা মুখ, যেন বারবার বলতে চায়, "তোমার প্রাণটা সত্যের জন্য বলি দাও, বাবা, এটাই তোমার পথ।"
আবদুর রহমান বুঝতে শুরু করল - তার জীবনের শেষ গন্তব্য হবে সেই বজ্রঝড়, যা বদলে দেবে নিপীড়িত শহরকে, কিন্তু প্রথমে তাকে নিজের ভিতর থেকে সেই অন্ধকারকে ভাঙতে হবে।
সময় গড়ায়।
আব্দুর রহমান এখন ষোলো বছরের কিশোর।
চেহারায় চমৎকার এক দৃঢ়তা, চোখে শূন্যতার ছায়া, কিন্তু মুখে সবসময়ই এক সামাজিক হাসি।
এই শহরে বেঁচে থাকতে হলে, সত্যের কথা ভুলে যেতে হয় - এই শিক্ষা সে পেয়ে গেছে।
তখনকার শহরের যুবসমাজ গড়ে উঠেছে ইন্টারঅ্যাকটিভ চ্যাট রুম, ভার্চুয়াল ফ্যামিলি, গেম লাইভস্ট্রিম আর অ্যানিমে ওয়ার্ল্ড ঘিরে।
রহমানও যুক্ত হয় - একটা আইডি খোলে, নাম দেয়: "DarkPhoenix_98"।
একদিন এক ভার্চুয়াল পার্টিতে সে বলে, "আসলে, আমি খুব নর্মাল। ধর্মীয় কিছু মনে রাখি না। আমি কেবল লাইফটা এনজয় করতে চাই।"
এটা মিথ্যা - তবে সে জানে, এই মিথ্যাই তাকে স্বাভাবিক বানায়।
তার চারপাশে বন্ধুবান্ধব তৈরি হয় - কিন্তু বন্ধুত্ব ছিল অনলাইন রিপ্লাই আর ইমোজির বন্ধন।
এডি - একজন রোবো-ফটোগ্রাফার, তার ক্যামেরা দিয়ে সে আবেগ পড়তে পারে, কিন্তু অনুভব করতে পারে না।
মিরা - জেন্ডার নিউট্রাল, যিনি ধর্মকে সোজাভাবে বলেন "এন্টি-প্রগ্রেসিভ", কিন্তু রহমানের চোখে এক দুর্বল বন্ধুর মতো ছিলেন।
জে.বি. - তার গেমিং টিম লিডার, যারা রোজ রাতে গেম খেলতো, আর সকাল পর্যন্ত ক্লাব হাউসে গান চলত। যেখানে 'আল্লাহু আকবার' শব্দটি হলে সবাই হেসে বলত - "এইটা তো পুরান সফটওয়্যারের রিস্টার্ট বাটন!"
রহমান এসব দেখে কষ্ট পেত, তবু সে চুপ থাকত - কারণ, তার চুপ করাটা তাকে বাঁচিয়ে রাখত, আলাদা না বানিয়ে।
একদিন, সে যখন আয়নার সামনে দাঁড়ায়, নিজেকে দেখে প্রশ্ন করে - "এই আমিই কি সেই ছেলেটা, যার বাবা শহীদ হয়েছিল বিশ্বাসের জন্য? আমার তো আর কিছু নেই, শুধু বাহ্যিকতা... আমি কি এখন ওদেরই মতো?"
তার বুকের ভিতর তখন এক নিরব বজ্র কেঁপে ওঠে, কিন্তু সে শব্দ করে না - কারণ, এই শহর শব্দকে ভয় পায়।
তবু মাঝে মাঝে, খুব নিঃশব্দ রাতে, সে ফিসফিস করে বলে - "আব্বু, তুমি যদি থাকতা..."
তার চোখের কোণে এক বিন্দু জল জমে।
কিন্তু সকালে আবার সে সবার মাঝে "DarkPhoenix_98", যার পৃথিবীতে ঈমান মানে ডিলিটেড ফোল্ডার।
এভাবে রহমান সমাজে মিশে যায়।
তার প্রাথমিক প্রশ্নগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসে।
তার কবিতার খাতা বন্ধ থাকে।
তার সিজদাহহীন রাতগুলোয় বাহ্যিক হাসি আর অন্তরের কান্না একে অপরের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে চলে।
রহমান এখন পুরোপুরি এই শহরের ছেলে।
ডিজিটাল পরিচয়ে তার ফলোয়ার লাখে, গেমিং টুর্নামেন্টে জয়ী, মিরার সাথে তার একটি ভার্চুয়াল রিলেশনশিপ চলছে - যেখানে আবেগের পরিবর্তে ইমোজি ব্যবহৃত হয়।
সে হাই-টেক রেস্টুরেন্টে খায়, আর NFT লাইভ আর্টে ইনভেস্ট করে।
তাকে দেখে কেউ বলবে না - এই ছেলেটি কোনোদিন সেজদাহর দিকে তাকিয়েছিল।
এমনকি তার মা-ও এখন আর প্রশ্ন করে না।
কারণ, মায়ের চোখে ছেলের সাফল্যই সুখ।
এই সমাজ তাকে দিয়েছে সম্মান, তবে ঈমান দেয়নি।
এই সমাজ দিয়েছে প্রযুক্তির উচ্চতা, তবে নিয়েছে বিশ্বাসের গভীরতা।
এক সন্ধ্যায়, রহমান উপস্থিত হয় "Solosphere Gala Night"-এ - নিও-জেডার সবচেয়ে নামী পার্টি।
তার পাশে ছিল জেবি, মিরা, আর আরও কিছু সোশ্যাল র‍্যাঙ্কড ইনফ্লুয়েন্সার।
স্টেজে উঠেই রহমানকে 'মাস্টার অফ স্পিরিচুয়াল ফিউচারালিজম' বলা হয় - কারণ, সে একবার বলেছিল, "ধর্ম থাক, কিন্তু রোবটই আসল মুক্তির দিশা।"
তখন সে সত্যিই বিশ্বাস করত না কথাগুলো, কিন্তু বলেছিল নিজের র‌্যাংক বাড়াতে।

পর্ব ৪

বর্তমান:
রাতে সে ঘরে ফিরে যখন দরজা বন্ধ করে, আয়নায় নিজেকে দেখে, তখন মনে পড়ে - বাবার কণ্ঠ, মায়ের চোখ, আর সেই কবিতার লাইন,
"যদি সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে প্রিয়
তবে দ্বীপ হয়ে তুমি জ্বলো..."
সে আয়নায় নিজের চোখে তাকায়... আর নিজেকেই চিনতে পারে না।
পরদিন ভোরে, সে হাঁটছিল শহরের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ রাস্তায় - যেখানে স্মার্ট স্ক্রিন নেই, কোনো স্ক্যানার নেই।
শুধু একটা পুরনো দেয়ালে একবার ভেজা হাতে লেখা একটি শব্দ দেখা গেল - "আল্লাহু আকবার।"
তার বুক থমকে গেল।
সেই শব্দ যেন এক বজ্রাঘাত করল মনে।
সে হাত ছুঁইয়ে দেয়াল ছোঁয়ার চেষ্টা করল। তখনই পাশে দাঁড়ানো এক সিকিউরিটি বট এসে বলল - "আপনি কি অবৈধ ভাবাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন? আপনার মানসিক স্থিতি যাচাই করা হবে।"
সে ফিরে এল, মুখে হাসি রেখে।
আবার অনলাইনে ঢুকল।
মিরাকে ভিডিও কলে বলল, "আজ একটা খুব আজিব জিনিস দেখলাম... আল্লাহু আকবার লেখা ছিল দেয়ালে!"
মিরা হেসে বলল, "ওমা! তুমি এত ব্যাকডেটেড শব্দ জানো কীভাবে?
রহমানও হেসে উঠল... কিন্তু সে হাসি ছিল ভেতরে এক ভয়াবহ শূন্যতার চিৎকার।
সেই রাতেই তার ঘুমে আবার ফিরে আসে সেই স্বপ্ন।
মুকুট ভেঙে পড়ে আছে, সামনে দাঁড়িয়ে সেই ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মানুষ - চিৎকার করে বলছে, "আয়! আরে আয় না! আমি তোকে খুঁজছি রে!"
জানালার কাঁচে জ্বলজ্বলে রঙের আলোকরেখা এসে পড়ছে।
এটি সূর্যের আলো নয়।
নিও-জেডা সিটির "ডে-লাইটিং সিস্টেম" - যেটা রাতকেও দিন বানায়, আর দিনকে স্টুডিওর মতো উজ্জ্বল করে তোলে।
আব্দুর রহমান চোখ খুলে তাকায় সেই কৃত্রিম সকালে।
তার ঘর - চারপাশে সিলিং থেকে ঝুলছে অটোমেটেড লাইটিং সাপ্লাই, দেয়ালে ঝুলছে প্রজেক্টেড ল্যান্ডস্কেপস, যার মাধ্যমে ঘরে সে একেকদিন একেক দেশ বেছে নেয়।
আজকের দিন সে রেখেছে মরুভূমির সকাল, তার মস্তিষ্ক বলে, এই পটভূমিতে সে কিছুটা বেশি শান্ত থাকে।
শরীরে এখনও গেমিং হেডসেটের ভার।
কাল রাতেও সকাল পাঁচটা পর্যন্ত ভিআর টুর্নামেন্ট চলেছে।
আবদুর রহমান সেখানে ছিল অন্যতম টপ প্লেয়ার - তার স্পন্সর জেনেটেক, যার লোগো এখন তার চোখের কন্ট্যাক্ট লেন্সে ভেসে উঠছে।
ঘুম থেকে উঠে তার কৃত্রিম সহকারী বলে উঠলো, "গুড মর্নিং, রহমান। আপনি আজ ৮ মিনিট কম ঘুমিয়েছেন। আপনার ডোপামিন লেভেল ৪.২% কম। অবিলম্বে স্পিরিচুয়াল স্পা অথবা ন্যুরো কফি সেশন নেওয়া পরামর্শযোগ্য।"
সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসে।
"না রে ভাই, আজ আমার 'আমাকেই' নিয়েই থাকতে দে।"
তার গলা ব্যঙ্গাত্মক, কিন্তু কোথাও যেন একটা ক্লান্তি লুকিয়ে আছে।
বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে করতে হঠাৎ তার চোখ পড়ে এক ফ্রেমের দিকে একটা ছবিতে তার মা দাঁড়িয়ে আছেন, মুখে প্রগাঢ় নিরবতা।
পেছনে কার যেন ছায়া, খুব অস্পষ্ট, তবু তার মনে হয় এই ছবিটা আসলে অসম্পূর্ণ।
ছবির বাঁ পাশে কারও একটা জায়গা ফাঁকা, যেন কেউ ছিল, নেই।
তার মা তাকে ছোটবেলায় বলেছিল, "বাবা ছিল এক ইমাম... খুব সাহসী।"
সে হেসে বলত, "আমার তো বিশ্বাস হয় না মা। যদি ইমাম হতো, তাহলে এই শহরে টিকে থাকতো কীভাবে?"
মা কিছু বলত না।
সে যখন ১০ বছর বয়সে প্রথম বাইরের স্কুলে গিয়েছিল, তখন ক্লাসে তাকে বলা হয়েছিল, "তোমাদের নামগুলো এক্সোটিক! রহমান, মানে কী?"
সে উত্তর দিতে পারেনি।
পরে বাসায় ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল।
মা বলেছিল, "রহমান মানে করুণা।"
সেই রাতেই সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, "করুণা? এই শহরে কে কাকে করুণা করে?"
তার প্রথম বন্ধুর নাম ছিল - এডি।
না, সে মানুষ না।
একটি ইমোশন-সিমুলেটিং হিউম্যানয়েড।
এডি তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, "তুমি আলাদা। তুমি অ্যানালিটিক্যাল হলেও কিছু সময় চুপচাপ থেকে যাও। ইমোশনাল ইমপালস?"
রহমান হেসে বলেছিল, "হয়ত আমার সফটওয়্যার অনেক পুরানো।"
তারা দুজন মিলে আকাশে উড়তে থাকা হলোগ্রাফিক ফানুস দেখেছিল, তারপর ভিআর সিনাগগ ভিজিট করেছিল, যেখানে দেখানো হচ্ছিল ধর্ম কিভাবে "মানব সভ্যতার প্রাথমিক গেম মেকানিক্স" ছিল।
প্রতিদিন রহমান আরও আধুনিক হচ্ছিল।
তার শরীর, মস্তিষ্ক, চিন্তা - সবকিছুই আপগ্রেডেড।
কিন্তু এক রাতে, যখন সে একা বারান্দায় বসে ছিল, তখন বাতাসে ভেসে আসা এক অদ্ভুত শব্দে তার ভ্রু কুঁচকে যায়।
"আল্লাহু আকবার..."
শব্দটা কোনো অ্যাপ থেকে আসেনি।
কোনো মিউজিক প্লে হচ্ছিল না।
বুকের মধ্যে বাজছিল সেই শব্দ।
সে শিউরে ওঠে।
"না... না... এটা কোথা থেকে আসছে?"
সে মাথা নিচু করে।
তার ইমপ্ল্যান্টেড স্মার্ট বোন কিছুই রেজিস্টার করেনি।
তবু, তার অন্তরে যেন কেউ কড়া নাড়ছে।
পরদিন সকালে সে মাকে জিজ্ঞেস করল - "তুমি আজও নামাজ পড়ো?"
মা চুপ।
তার ঠোঁটে এক ধরনের কৃতজ্ঞতা ও কান্নার রেখা।
"না বাবা। তোমার স্কুলে পড়া শুরু করার পর বন্ধ করে দিয়েছিলাম। একদিন তোমার বন্ধুরা বলেছিল, ' আপনি মুসলিম?'"
তারপর দীর্ঘ চুপচাপ সময়।
রহমান বলে, "আমরা কি মুসলিম?"
মা উত্তর দেয় না।
সেই নিঃশব্দতাই তার সবচেয়ে বড় উত্তর।
রহমান আবার পার্টিতে যায়, আবার স্পন্সরড পোস্ট করে - "ধর্ম হ্যাজ এ বিউটিফুল হিস্টরি, বাট সো ডাজ ম্যাজিক।"
তার ফলোয়ার বেড়ে যায় আরও পঞ্চাশ হাজার।
কিন্তু রাতে তার ঘুম আসে না।
স্বপ্নে আবার সেই চেনা দৃশ্য - একটি মুকুট, গুঁড়িয়ে পড়া, তার পাশে ঝাঁকড়া চুলের মানুষ, চোখে আগুন, কণ্ঠে বজ্র - "আয় না! তোকে খুঁজে ফিরছি রে! তুইই পারবি..."
সে চিৎকার করে জেগে ওঠে।
অপ্সি, তার এআই সহকারী বলে ওঠে, "আপনার পালস ১৭৪। আপনার মানসিক চাপে রয়েছে অতীত ভিশনের উপসর্গ। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট কনফার্ম করবো?"
সে ধীরে ধীরে বলে, "না... আমি ঠিক আছি। মুক্তি চাই না, আমি উত্তর চাই।"
রাত আটটা।
নিও-জেডার বুকে আলো ঝলমলে "প্লাজমা রিং ক্যাফে"।
রহমান ছাদে দাঁড়িয়ে, কাঁধে ডিজিটাল জ্যাকেট, যার রঙ ব্যবহারকারীর মুড বুঝে নিজেই বদলে যায়।
আজ সেটি নীল থেকে বেগুনি।
তার কানে একপাশে ফ্লোটিং হেডফোন, আর মুখে ঠোঁটের কোণে একটা হালকা ঠাট্টার হাসি।
সামনে এলেন মিরা, চোখে ইনফ্রা-রিডার গ্লাস, ঠোঁটে হাইপারগ্লো।
"হে ফিনিক্স, দিনটা কেমন গেল?"
"অনেস্টলি? সিপিইউ কিছুটা ওভারহিট করতেছিল, বাট আই ইন্সটলড এ নিউ ডোপামিন প্যাচ - নাও উই'র চিলিন', বেবি।"
"হাহা ক্লাসিক ইউ! রিলিজিয়াস-বয়-টার্নড-সাইবার-ব্যাডি!"
"না, আই ওয়াজন্ট ইভেন রিলিজিয়াস। মাই ফ্যাম ওয়াজ জাস্ট... ইউ নো... ওল্ড ভার্সন মুসলিমস। নট ইভেন আপডেটেড।"
সে চোখ টিপ মারে।
টেবিলে যোগ দেয় জেবি, শহরের নামি স্ট্রিমার।
"ইয়ো ব্রো, হার্ড ইউ রিফিউজড দ্যাট ইসলামিক ডকুসিরিজ কোলাব?"
"অফ কোর্স। দে ওয়ান্টেড মি টু সে বিসমিল্লাহ বিফোর ইন্ট্রো। ইমাজিন মাই অডিয়েন্স? আনসাব ওয়েভ উড হিট লাইক এ সুনামি!"
"হাহাহা ব্রোও, ইউ স্যাভেজ!"
"না ম্যান, আই'ম স্মার্ট। দ্যাট কাইন্ডা ব্র্যান্ডিং স্লোজ গ্রোথ রেট। অ্যালগরিদমস হেট স্পিরিচুয়ালিটি।"
রহমানের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিটিজ রীতিমতো ফর্মুলায় চলে। সকাল: মোটিভেশনাল ওয়ান-লাইনার, "পিস ভাইবস।" দুপুর: কফি কোলাব পোস্ট। সন্ধ্যা: "টেক ইজ মাই গড" স্টাইল অ্যাস্থেটিক। রাত: ভিআর হ্যাঙআউট।
সে জানে কাকে কখন কী বলতে হয়, কে কোথায় কী খেতে চায়, কীভাবে কথায় মজা রেখে আলোচনাকে মসৃণ করে তুলতে হয়।
একবার তো সে লাইভে এসে বলেছিল, "আই ডু বিলিভ ইন গড… আই মিন, গুগল। সেম থিং, রাইট? দে বোথ নো এভরিথিং।"
কমেন্টস ভরে উঠেছিল হাসির তুফানে।
জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজ সফটওয়্যারে যুক্ত।
নামাজ তো দূরের কথা, কোনো আধ্যাত্মিকতা মানেই তার কাছে "টু ভিন্টেজ টু কেয়ার।"
তবে সে শুধু "ভবিষ্যতের মানুষ" না, সে এক চতুর, স্বচ্ছন্দ, আপাত-বুদ্ধিমান চিত্রনায়ক, যে জানে কীভাবে আধুনিকতাকে ব্যবহার করে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা যায়।
এক রাতে হঠাৎ গ্লাসে জল নিয়ে চুমুক দিতে দিতে এক সেকেন্ডের জন্য মিরা তাকে জিজ্ঞেস করল - "হে... ইউ এভার ওয়ান্ডার হু ইউর ড্যাড রিয়েলি ওয়াজ?"
গ্লাসের পানি ঠোঁটে লেগে থেমে গেল।
এক ফ্রেমের মতো মুহূর্তে তার চোখে এক ঝলক ছবি ভেসে ওঠে - এক অজানা মুখ, মুকুট ভেঙে পড়া, আর সেই চিৎকার: "আয় না!"
সে ঠোঁটে এক ঠান্ডা হাসি এনে বলল - "না, জাস্ট এ গ্লিচ ইন দ্য স্টোরি। আই অলরেডি আপডেটেড দ্য স্ক্রিপ্ট।"
মিরা হেসে পড়ে, কিন্তু রহমান... তার হাসির পেছনে মাথার ভেতর আরেকটা স্ক্রিন অন হয়ে যায়।
সেই স্ক্রিনে কেউ কেউ তখনও লিখে রেখেছে - "আল্লাহু আকবার..."
আব্দুর রহমানের সকালটা শুরু হয় - ঘুম ভাঙার আগেই।
স্লিপসিঙ্ক বেড তার ব্রেনওয়েভ বিশ্লেষণ করে বুঝে যায় কখন তার আরইএম সেশন শেষ হচ্ছে, আর তখনই সিলিং থেকে ধীরে ধীরে ভেসে আসে পরিষ্কার নীল রঙের হাওয়া, যার মধ্যে মিশে থাকে হালকা ইলেকট্রনিক গানের প্যাটার্ন।
রহমান উঠে বসে।
সাথে সাথেই খুলে যায়: খবর, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্ট্যাটাস, আজকের মনোযোগ ক্ষমতা কত পার্সেন্ট।
"বাস্তব কফি আজকাল কেউ খায়?" সে একা একাই হাসে।
তার কাজ? ইন্টারফেস ব্র্যান্ডিং এক্সপার্ট।
মানে - সে প্রোডাক্টের চেহারা সাজায়।
তবে তার মূল পরিচয়: সিটি ইনফ্লুয়েন্সার, ড্রিমশিফটার।
তার টাইমলাইনভরা মানুষ কোনো ধর্মে বিশ্বাস করে না, কিন্তু খারাপ লাগে না।
ঈমান শব্দটা শুনলে মনে পড়ে পুরনো সিনেমার কোনো মিথিক জনরা।
ইসলামের প্রতি বিরূপতা নয়, একধরনের জড়তাভরা বিরক্তি।
আর এদেরই মাঝে রহমান এক স্বচ্ছন্দ নায়ক।
একবার এক পাবলিক ফোরামে এআই-সংক্রান্ত প্রশ্ন উঠেছিল - "ডু ইউ থিংক এআই শুড হ্যাভ রাইটস লাইক হিউম্যানস?"
রহমান মুচকি হেসে বলেছিল, "ব্রো, হিউম্যানস লস্ট রাইটস বিফোর এআই ইভেন গট দেম।"
পুরো অডিটোরিয়াম হেসে উঠেছিল।
সে জানে, হালকা বিদ্রূপে মানুষ খুশি থাকে।
সে রাতে, এক রুফটপ পার্টিতে, নাদিন নামের এক ডিজাইন-ইঞ্জিনিয়ার মেয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
ছোট্ট কথোপকথনে ধর্ম ছুঁয়ে যায়, কিন্তু ছুঁয়ে গিয়েও হারিয়ে যায়।
"তুমি কি কোনো বেলিফ সিস্টেমে বিশ্বাস করো?"
"হমম... আমি বেলিফে না, ব্যালেন্সে বিশ্বাস করি। যে জিনিস আমাকে এফিশিয়েন্ট রাখে, আমি সেটাকেই ফলো করি।"
"আর তোমার বাবা?"
"আরে... সেই তো লং ডিলিটেড। মম ইউজড টু সে হি ওয়াজ 'ডিফারেন্ট'। আই থিংক দ্যাট মিনস পুওর।"
সে হাসে। নাদিনও হাসে। এরপর আবার গ্লাস তোলে।
বাড়ি ফেরার সময় সে দেখে, নিও-জেডার "ফ্রিডম প্লাজা"-তে কেউ একজন গোপনে কিছু ফিসফিস করে যাচ্ছে।
"ওই লোকটা কে?" সে সিকিউরিটি বটকে জিজ্ঞেস করে।
"দ্য সাবজেক্ট হ্যাজ বিন আইডেন্টিফাইড অ্যাজ মার্জিনালাইজড স্পিরিচুয়ালি। লেভেল ওয়ান ওয়ার্নিং ইস্যুড।"
সে চোখ তুলে দেখে - এক বৃদ্ধ লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে কী যেন বলছে।
তার হাতে কিছু নেই, তার চারপাশে কেউ নেই।
শুধু চোখ দুটো অদ্ভুত গভীর।
রহমান হাঁফ ছেড়ে বলে - "দে নেভার আপডেট, হা?"
এবং নিজের হোভারবাইক ছুঁড়ে দেয় বাতাসে।
এভাবেই দিন চলে যায়।
ধর্ম নেই। প্রশ্ন নেই।
রহমান সুখী - সারফেস লেভেলে।
ভেতরে? ওটা এখনো কোনো আলো খুঁজে পায়নি।
আর তার ঘরের দেয়ালে, একদিন সে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে - "দিস সিটি ইজ মাইন। গড ডাজন্ট লিভ হেয়ার এনিমোর।"

পর্ব ৫

জেনি, এক প্রাক্তন ধর্ম-বিদ্রোহী, এখন টেক-নোয়ার ইনফ্লুয়েন্সার।
আয়া, এক এআই আর্টিস্ট, যার ক্লেইম টু ফেম হলো - সে একবার 'কুরানিক ভার্স' নিয়ে ডিজিটাল গ্লিচ আর্ট বানিয়ে সেটা এনএফটি করে বিক্রি করেছে।
আর কোয়েল, বাংলার বংশধর, কিন্তু বলে "বাংলা ইজ ডেড. সিনট্যাক্স ইজ আওয়ার ফিউচার।"
রহমান ওদের মাঝে আড্ডায় থাকে, তর্কে থাকে।
"তুই তো মুসলিম ঘরের, তাই না?" - একদিন বলেছিল জেনি।
সে চুপ করে ছিল।
"রিল্যাক্স ব্রো, নো অফেন্স। আমিও একদিন বিশ্রী ভয় পেতাম 'আল্লাহ' নামটা শুনে। দেন আই ওক আপ - ওক, গেট ইট?"
সে হেসে ওঠে নিজেই।
আয়াও তখন বলে - "তুই যদি এখনো পুরোনো কথাগুলো মনে রাখিস, সেটা অনলি মিনস ইউ ওয়্যার নেভার রিপ্রোগ্রামড প্রপার্লি।"
তারা হাসে। রহমানও।
"আই'ম গুড উইথ মাই বাগস," বলে সে।
আর ওদের সঙ্গে ভিআর পার্টিতে ঢুকে পড়ে।
একাকী রাতে - যখন সে নিওপাব থেকে ফিরছে, হলোগ্রাফিক বিলবোর্ডে কোনো এক পরিত্যক্ত বাণী জ্বলজ্বল করে ওঠে - "আল-মালিক, আল-কুদ্দুস, আস-সালাম..."
রহমান দাঁড়ায়।
তার নিউরাললেন্স-এ এরর দেখায় - "আননোন সিমেন্টিক গ্রুপ: ডিভাইন অ্যাট্রিবিউটস।"
সে হেসে ফেলে।
"ওয়াও। দে ইভেন ডিলিটেড দ্য নেমস।"
তবে সে এসব ভুলে যায়।
কারণ এই শহরে ভুলে যাওয়াটাই স্মার্টনেস।
এই শহরে প্রশ্ন নয়, পরবর্তী আপডেটই একমাত্র সত্য।
সে একবার এক নারীকে জিজ্ঞেস করেছিল - "তুমি কি মনে করো, অতীতে কোনো সত্তা ছিল যাকে মানুষ 'ঈশ্বর' বলত?"
সেই নারী তাকে বলে - "ইউ মিন, লাইক... দ্য এনশিয়েন্ট অপারেটিং সিস্টেম? না। ইট ক্র্যাশড সেঞ্চুরিজ অ্যাগো।"
রহমান এখন টেকনো ক্লাবের সিলভার মেম্বার।
নতুন ফিচার অ্যাক্সেস করে সে সবার আগে।
তার প্রোফাইল ডেটা এমন - নাম: রাফি । বিলিফ সিস্টেম: আনডিফাইন্ড। ইমোশনাল সিঙ্ক: ৯১ শতাংশ। সোশ্যাল ট্রাস্ট র‍্যাঙ্ক: এ.টু। স্পিরিচুয়াল এক্সপোজার: ০.৪ শতাংশ - ডরম্যান্ট।
নিশ্চুপ।
নির্বাক।
সে ভুলে গেছে তার বাবা কে ছিলেন।
সে জানেই না - একসময় তার পরিবার ছিল একজন "হারিয়ে যাওয়া পুরুষ"-এর উত্তরাধিকার।
তার মা শুধু একদিন বলেছিল - "তুই জন্মেছিলি এক শোকের দিনে। তোর আব্বা সেইদিন..."
সে আর বলেনি।
তাকিয়েছিল একবার, চোখে জল।
রহমান তখন ব্যস্ত ছিল একটা গেম জিততে।
সে এখন অনেক "কুল।"
নাম তার "রাফি ।"
তাকে এখন লাইভ শোতে ডাকা হয় - "টক টু আস অ্যাবাউট পোস্ট-ফেইথ মাইন্ডফুলনেস..."
সে বলে - "ফিল। ডোন্ট নিল। ফরগিভ। বাট নেভার ফিয়ার। বিকজ গড ইজন্ট ইন দ্য স্কাই এনিমোর - হিজ ইন ইউর অ্যালগরিদম।"
সবার হাততালি।
রহমান হাসে।
তারপরের কয়েকটি দিন - না, আসলে মাস - একপ্রকার চলেই যায়।
উন্নত শহরের রাতগুলো কখনও নিস্তব্ধ হয় না।
তারা না ঘুমিয়ে বেঁচে থাকতে শিখে গেছে।
ঘুম এখন শুধুই অপশনাল লাইফ-সার্ভিস।
রহমান দিনে একবার ঘুমায়, ভিআর ঘুম, যেখানে সে নিজে নিজের স্বপ্ন ডিজাইন করে।
এতে সে যা চায়, তা-ই দেখে। না চাইলে ঘুমই করে না।
মান্নান, তার ছায়ার মতো, সবসময় পাশে।
তবে সে এখন আর আগের মতো সেই মৃদু, মলিন মানুষ নয় - বরং সে শহরের পোলাপানদের নেতা, একধরনের স্ট্রিট-সোশ্যাল ডিলার।
বিনিময়ে যা দেয়, তা শুধু ঘ্রাণ বা নেশা নয় - বরং অনুভূতির ডিজিটাল ফর্ম।
ভালোবাসা, সাহস, লজ্জা, দুঃখ - সব কিনতে পাওয়া যায়, ৩০ মিনিটের সাবস্ক্রিপশনে।
"তুই জানিস, রাফি..." একদিন রাস্তায় বসে মান্নান বলে, "এই শহরে মসজিদের গম্বুজ আর কবরস্থানের গম্বুজ আলাদা বোঝা যায় না।"
সে হাসে - কিন্তু সেই হাসি তিক্ত।
রহমান বলে, "শহর যখন মরেই গেছে, তখন কবরের কী দরকার?"
তার গলায় হাসি নেই - আছে বিতৃষ্ণা।
"এই শহরে কেউ মরে না" - জিনো একবার বলেছিল। "তারা শুধু লগআউট হয়ে যায়।"
আয়ার সাথে এক সন্ধ্যায় রহমান একটা শর্টড্রিমে গিয়েছিল।
সেখানে সে এক ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মানুষ দেখে - কিন্তু এবার সেই মানুষ তার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে ছিল।
সেদিকে তাকিয়ে রহমান বলে - "হেই! আই নো ইউ!"
কিন্তু মানুষটি মুখ ফিরিয়ে কিছুই বলে না।
এক রাতে, স্টিলনাইট পার্টি থেকে ফেরার পথে মান্নান বলে, "শোন, ভাই, আজ একটা নতুন জিনিস আনছি। পুরান যুগের এক জিনিস - ওইটারে বলে লাল শরবত। না রে, রক্ত না - তোর মতো অসভ্যরা সেইটা ভাবে। এইটা এক ধরনের ইথিক্যাল ওয়াইন, মন পরিষ্কার করে। অন্যরকম, বুঝলি?"
তারা ওঠে একটি টাওয়ারে - তিনশোতলা বিল্ডিং, যার নাম "স্কাইফিত্রা।"
এখানে ছাদে, ৩৬০-ডিগ্রী আলোর মাঝে বসে, মানুষ আর মানুষ থাকে না।
তারা হয়ে যায়, পার্টি-ডেটা।
মান্নান এক বোতল বের করে।
কাঁচের মতো স্বচ্ছ।
ঢালল এক গ্লাসে।
রহমান নিল এক চুমুক।
আর ঠিক তখনই - এক মুহূর্তে - সমস্ত আলো স্তব্ধ হয়ে যায়।
বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে থাকা বিলবোর্ডগুলো অন্ধকার হয়ে পড়ে।
শুধু একটি পুরনো এলইডি বিলবোর্ডে লেখা ওঠে -
"৭ জুলাই ২০২৫।
মুকুট ভাঙা হয়েছিল আজ।
তুমি কি মনে রেখেছো?"
রহমান যেন গিলে ফেলে এক হিমশীতল কিছু।
তার বুকের ভেতর কোথা থেকে এক ধাক্কা উঠে আসে।
তখনই সে টালমাটাল হয়ে পড়ে।
চোখে ঘোর।
চারপাশ ঘুরে যায়।
আর তখন, এক ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে বলে -
"তুই-ই তো! আমরা তোকে খুঁজছিলাম রে! এই মুকুট কেউ ছুঁতেই পারেনি। তুই, তুই ভেঙে দিলি!"
রহমান চিৎকার করে ওঠে - "না... না... আমি না...!"
সে ঘুম থেকে উঠে বসে পড়ে, এক ঝটকায়।
তার শরীর ঘামে ভেজা।
হাত কাঁপছে।
দেহ কাঁপছে।
মান্নান দৌড়ে আসে।
"এই, কি হইছে তোর?"
"কিছু না... একটা ড্রিম..."
"সালা আমার তো কিছুই হলো না। চল, যাই।
রহমান তখনো ধীরে ধীরে চোখ মুছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে - "নিউজ পেপার, ৭ জুলাই... ২০২৫..."
রহমান আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার চোখ যেন দূরে কোথাও আটকে গেছে।
না, সে ২২২৬-এর আকাশ দেখছিল না - সে দেখছিল ২০২৫-এর ছায়া।
অন্তরে এক অস্থিরতা, গলায় যেন পাথর।
কিন্তু মুখে - সেই চিরচেনা স্মার্ট হাসি।
"বাহ!" - মান্নান চিৎকার করে ওঠে - "এই মাত্র ফায়ারফক্স টাওয়ারে 'হিউম্যান কনসিয়াসনেস রিফ্রেশমেন্ট পার্টি' শুরু হইছে। আজকে না গেলে, ভাই, পুরো শহর ভাববে আমরা লো-গ্রেড নস্টালজিয়া অ্যাডিক্ট!"
রহমান চোখ সরিয়ে নিল।
মনে মনে বলল, "আমি কি এখন নস্টালজিয়া অ্যাডিক্ট?"
সে তো শুধু একটা স্বপ্ন দেখেছে।
একটা মুকুট। একটা ভাঙা সিংহাসন।
এক ঝাঁকড়া চুলওয়ালা অচেনা মুখ, যার চোখে ছিল এক ধরনের কান্না আর আনন্দের মিশ্র ভাষা।
কিন্তু বাহ্যিক কিছুই তার মুখে ধরা পড়ল না।
এখন, ২২২৬ সালে, সবচেয়ে বেশি ইনভেস্টমেন্ট হয় 'বিলিফ ডিকনস্ট্রাকশন প্রোগ্রাম'-এ।
ধর্ম নেই - এটা প্রমাণ করতে কোটি টাকা খরচ করে!
বিশ্বের সেরা কৃত্রিম আনন্দের ল্যাব, যেখানে ফিলপিলস বিক্রি হয়।
ফিলপিলস - এক ট্যাবলেট খাও, আর ১০ মিনিটের জন্য তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী বাবা, বা সবচেয়ে সম্মানিত নায়িকা, বা সবচেয়ে বড় রকস্টার।
মান্নান ২টা নিল। রহমান ১টা।
তখনই এক নারী আসে - স্মার্টচশমা পরা, চুল সবুজ-কালো রঙে বাঁধা, নাম জিঙ্কা।
সে একটা মডারেট অ্যাক্টিভিস্ট, ধর্মের বিরুদ্ধে না, কিন্তু তার পক্ষে কেউ কিছু বললে ছিঁড়ে খায়।
জিঙ্কা বলে, "ইউ'র আব্দুর রহমান, রাইট? দ্য ইমোশন ম্যাপার?"
রহমান মাথা নাড়ে।
"ইউ লুক... রেস্টলেস। ওয়ান্ট টু ট্রাই 'কোয়েটস্টর্ম'? এ নিউ ইমোশন। ইটস লাইক ক্রাইইং ইন পিস।"
রহমান আবার সেই চেয়ে থাকা চোখে তাকিয়ে থাকে জিঙ্কা-র দিকে।
সে ভাবে - "আমি কি কাঁদতে পারি এখনো?"
তখন, দূরে কোথাও, এক বিলবোর্ড জ্বলে ওঠে - আবার সেই লাইন:
"৭ জুলাই ২০২৫।
তুমি কি মনে রেখেছো?"
রহমান এবার চোখ বন্ধ করে।
একবার যেন বাতাসে ভেসে আসে একটা পত্রিকার খসখস শব্দ।
একটা মুকুটের ভাঙার আওয়াজ।
সে চমকে ওঠে।
তার মনে পড়ে - তারা আবার সেই পার্টির দিকে যাচ্ছে, যেদিন সবকিছু প্রথমবার ঘুলিয়ে উঠেছিল।
সেই রাত, যেদিন রাত হঠাৎ করে দিনের মতো জ্বলে উঠেছিল।
ফায়ারফক্স টাওয়ারের ছাদে ঝলমলে পার্টি চলছিল।
চারপাশে অদ্ভুত এক জগৎ - মানুষ, কিন্তু মানুষ নয়।
শরীর আছে, আত্মা নেই।
হাসি আছে, কিন্তু হৃদয়ের খোঁজ নেই।
প্রত্যেকের মুখে 'স্মার্টমাস্ক' - ত্বক নিখুঁত, চোখ উজ্জ্বল, কিন্তু ভেতরটা... শূন্য।
রহমান সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল - একটা গ্লাস হাতে, গায়ে নিওনফেজ জ্যাকেট, চোখে সেই চিরচেনা অভিজাত ভাব।
তার চারপাশে মানুষ, আলো, শব্দ, জ্ঞান আর বিকৃতি - সবকিছু মিলেমিশে এক মায়া তৈরি করেছিল।
"ওই রহমান, ওই!" - মান্নান ডাক দেয়, "তুই কি আসলেই হিউম্যান, না শুধু হিউম্যানের কোস্টিউম পরে ঘুরিস?"
রহমান হেসে ওঠে।
"আই'ম এ কনসেপ্ট, ব্রো। কখনও আবেগ, কখনও অ্যালগরিদম। তুই কী?"
"আমি তো নেহাতই নেশা। আজকে নিলাম নিউরোমেল্ট। এই শহরে সুখ খুঁজলে, স্মৃতি প্রথমে ডিলিট করতে হয়।"
পাশ থেকে জিঙ্কা বলে ওঠে, "আজকের পার্টিতে এআই-রা আসবে। মানবিক রোবট। যারা প্রেমে পড়তে পারে!"
একটু দূরে ডিজে বাজাচ্ছিল "সিন্থেটিক সোল সিম্ফনি।"
তাতে মিশে ছিল আয়াতের সুর, কিন্তু বিকৃত করে রাখা।
শব্দ ছিল ঠিকই - "আল্লাহু নূরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ।"
কিন্তু তার নিচে চলে যাচ্ছিল এক ডিজিটাল বিট -
ফেইথ টার্নড ফ্যাশন। রেভিলেশন টার্নড রিদম।
রহমান প্রথমে হাসল, কিন্তু কিছু একটা তার হৃদয়ে কেঁপে উঠল।
সে জানতো না কেন, এই বিকৃত আয়াত তার বুকের ভিতর ঝড় তুলছে।
তখনই...
হঠাৎ যেন সব শব্দ নিঃশব্দ হয়ে গেল।
তার মাথা ঘুরে উঠল।
পায়ের নিচে মাটি যেন এক সেকেন্ডের জন্য হারিয়ে গেল।
সে চারপাশ দেখতে লাগলো - মানুষদের মুখগুলো অদ্ভুত রোবটিক হয়ে উঠছে।
তারা হাসছে, কথা বলছে, কিন্তু কোনো মানবিক স্পন্দন নেই।
রহমান আবার সেই বিলবোর্ডের দিকে তাকাল - সেখানে তখন শুধুই জ্বলছে এক বাক্য -
"৭ জুলাই ২০২৫।
তুমি কি মনে রেখেছো?"
তার ভেতরে যেন একটা কম্পন হলো।
মনে হলো, বুকের এক গভীর অংশ কেউ ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলেছে।
সে চোখ বন্ধ করল।
তারপর -
চারপাশে আর কিছু নেই।
শুধু ধোঁয়া।
ধোঁয়ার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সে।
হঠাৎ সে দেখতে পেল সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লোকটি।
চোখে অশ্রু, গলায় আর্তি।
"আব্দুর রহমান! আজ পর্যন্ত কেউ এই মুকুট ভাঙতে পারেনি। এটি তোলার শক্তিও কারো ছিল না। তুই আছড়ে ভেঙে দিলি! তোকেই তো খুঁজতেছি! আয়... আরে আয় না! আমার কাছে আয়!"
সে মুকুটের পাশে পড়ে আছে একটি পুরনো কাগজ।
তারিখ লেখা - ৭ জুলাই ২০২৫।
এক ঝাপসা আলোয় রহমান দেখতে পায়, নিজে দাঁড়িয়ে আছে মুকুটের ওপর।
এক পা সামনে - ভাঙা প্রতীকের ওপর।
চারপাশে মৃত্যু, অথচ সে যেন জীবনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে।
"না!!!"
রহমান হঠাৎ করে চিৎকার দিয়ে উঠে পড়ে।
ঘামে ভেজা গা, হাঁফাতে হাঁফাতে।
"না... না! এটা কী ছিল?!" সে নিজেকেই প্রশ্ন করলো।
পাশে বসে ছিল মান্নান।
গ্লাসটা মাটিতে পড়ে গেছে।
"তোর কি হইছে ভাই?! চিৎকার করতেছিলি। ঘুমাইছস তো মাত্র, আবার এমন হলো?"
রহমান থমকে যায়।
সে কিছু বলে না।
তার দৃষ্টি তখন ঘরের এক কোণায় রাখা আয়নার দিকে - সেখানে সে দেখতে পেল নিজের চোখে একরাশ অজানা প্রশ্ন।
যা ২২২৬ সালের প্রযুক্তি দিয়েও বোঝা সম্ভব নয়।
মান্নান পাশে বসে হেসে বলে - "ভাই, তোর মনে হয় ড্রিমল্যাগ হয়েছে! তুই তো ২০২৫ দেখছিস নাকি?"
"হুম..." রহমান হালকা করে বলল, "হয়তো।"
আর তখনই, হালকা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলল -
"৭ জুলাই... ২০২৫... আমি কি সেই দিন জন্মেছিলাম?"
মান্নান কিছু বুঝতে না পারলেও রহমানের বুকের গভীরে কাঁপন চলছিল।
অজানা এক দিন,
অজানা এক পুরুষের আহ্বান,
একটি মুকুট,
একটি পত্রিকা,
একটি ভাঙা প্রতিজ্ঞা...
সব মিলিয়ে আব্দুর রহমান বুঝে উঠতে পারছিল না -
সে কি সত্যিই অতীতের সন্তান,
নাকি অতীতের অসমাপ্ত কোনো কসমের ধারক?

পর্ব ৬

সে কি সত্যিই অতীতের সন্তান,
নাকি অতীতের অসমাপ্ত কোনো কসমের ধারক?
এই প্রশ্নটা তার মাথায় ঘুরতে থাকে।
দিনের পর দিন।
রাতের পর রাত।
সে পার্টিতে যায়, হাসে, কথা বলে -
কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা দরজা আছে
যেটা বন্ধ ছিল বহুদিন,
আর এখন কেউ সেটা ধীরে ধীরে ঠেলছে।
একদিন সকালে রহমান তার ডেটা-ফিড স্ক্রল করতে করতে থমকে যায়।
একটা পুরনো আর্কাইভ ফাইল - সিস্টেম থেকে অটো-জেনারেট হয়েছে।
তাতে লেখা: "আন্সেস্ট্রাল রেকর্ড - ফারুক আলী, ইমাম। স্ট্যাটাস: ইরেসড। ইয়ার: ২২০০।"
রহমান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার আঙুল স্থির।
ইরেসড - মুছে ফেলা হয়েছে।
শুধু একটা শব্দ।
কিন্তু সেই শব্দটা তার বুকের ভেতর যেন একটা পাথর ছুঁড়ে মারল।
সে ফাইলটা খোলার চেষ্টা করে।
সিস্টেম বলে - "এক্সেস ডিনাইড. ফ্ল্যাগড কনটেন্ট: রিলিজিয়াস আইডেন্টিটি।"
রহমান চেয়ারে হেলান দেয়।
ছাদের দিকে তাকায়।
তার মাথায় ঘুরতে থাকে সেই একটা কথা -
"তুমি যদি সত্য চাও, তবে সাহস রেখো।"
কোথায় পড়েছিল এই কথা?
কার কণ্ঠে শুনেছিল?
সে মনে করতে পারে না।
কিন্তু কথাটা তার মনে আছে।
অনেকদিন ধরেই আছে।
সেদিন বিকেলে সে মান্নানকে বলে,
"আমার বাবার নাম ফারুক আলী।
সে ইমাম ছিল।
তাকে মুছে ফেলা হয়েছে।"
মান্নান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর বলে,
"তুই এইটা কোথায় পেলি?"
"সিস্টেমে।"
"সিস্টেমে যা থাকে সেইটা সত্য না রে।
তুই জানিস, ওরা যেকোনো কিছু ফ্ল্যাগ করে দেয়।
হয়তো তোর বাবা শুধু একটু বেশি কথা বলতেন।"
রহমান মাথা নাড়ে।
"না মান্নান।
ইরেসড মানে ইরেসড।
এই শহরে শুধু তাদেরই মোছা হয়,
যারা কিছু একটা ছিল।"
মান্নান আর কথা বলে না।
তার চোখে একটা অস্বস্তি।
সেই রাতে রহমান তার মায়ের কাছে যায়।
তার মা এখন শহরের একটা ছোট্ট কোয়ার্টারে থাকেন।
একা।
চোখে সবসময় একটা দূরত্ব।
রহমান দরজা খুলে ঢোকে।
মা তাকায়।
কিছু বলে না।
রহমান সোজা বলে,
"মা, আব্বু কোথায়?"
মায়ের হাত থেমে যায়।
সে যে কাপটা ধরেছিল, সেটা নামিয়ে রাখে।
"তুই..."
"মা, আমি জানতে চাই।
সিস্টেমে দেখলাম - তাকে ইরেসড করা হয়েছে।
এর মানে কী?"
মায়ের চোখ ভিজে আসে।
অনেকক্ষণ চুপ থাকেন।
তারপর বলেন,
"তোর জন্মের দিন তোর বাবাকে নিয়ে গিয়েছিল।
তুই কাঁদছিলি।
বাইরে ঝড় ছিল।
আমি জানালা দিয়ে দেখেছিলাম -
তোর বাবা যাওয়ার আগে একবার ঘুরে তাকিয়েছিল।
শুধু একবার।
তারপর আর দেখিনি।"
রহমান বসে পড়ে।
মেঝেতে।
তার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ছে।
"সে কি বেঁচে আছে?"
মা উত্তর দেন না।
শুধু বলেন,
"তোর বাবা বলতেন - সত্য কখনো মরে না।
শুধু লুকিয়ে থাকে।"
পরদিন থেকে রহমান বদলে যেতে শুরু করে।
বাইরে নয় - ভেতরে।
সে এখনো পার্টিতে যায়।
এখনো হাসে।
কিন্তু এখন সে প্রশ্ন করে।
একদিন জিনো কে জিজ্ঞেস করে,
"তুই বলিস ধর্ম মিথ্যা।
কিন্তু এই মহাবিশ্ব কোথা থেকে এলো?"
জিনো হাসে।
"বিগ ব্যাং, ব্রো।"
"বিগ ব্যাং হওয়ার আগে কী ছিল?"
জিনো থামে।
"মানে?"
"বিগ ব্যাং একটা ঘটনা।
ঘটনার আগে কিছু একটা থাকতে হয়।
সেটা কী?"
জিনো কাঁধ ঝাঁকায়।
"আননোন।"
"আননোন মানে অস্বীকার নয়।
আননোন মানে - তুই জানিস না।
আর যা জানিস না, তা নেই সেটা কীভাবে বলিস?"
জিনো কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর হেসে বলে,
"রাফি, তুই কি রিলিজিয়াস হয়ে গেছিস?"
রহমান হাসে।
"না।
আমি শুধু প্রশ্ন করছি।
তোরা কি প্রশ্নকে ভয় পাস?"
এই ছোট্ট কথোপকথনটা ছড়িয়ে পড়ে।
পরদিন আয়া এসে বলে,
"শুনলাম তুই জেনোকে কর্নার করেছিস।"
"না, আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম।"
"সেইম থিঙ্ক।
এই শহরে প্রশ্ন করা মানেই বিপদ।"
রহমান তার দিকে তাকায়।
"তুই সেই যে কুরআনের আয়াত নিয়ে এনএফটি বানিয়েছিলি -
সেই আয়াতের মানে কি তুই জানিস?"
আয়া একটু অস্বস্তি বোধ করে।
"না।"
"পড়েছিস কখনো?"
"না।"
"তাহলে যা বোঝোনি, যা পড়োনি -
তা দিয়ে ব্যবসা করলি কেন?"
আয়া চলে যায়, উত্তর না দিয়ে।
সেই রাতে রহমান একা বসে আছে।
তার সামনে একটা স্ক্রিন।
সে সার্চ করে - "কুরআন।"
সিস্টেম বলে,
"রেস্ট্রিকটেড কনটেন্ট। রিকোয়ার লেভেল ৩ ক্লিয়ারেন্স।"
সে থামে।
তারপর আবার সার্চ করে - "এনসিয়েন্ট টেক্সট। ইয়ার ৬০০ সি ই। আরাবিক কুরআন।"
এবার কিছু ফাইল আসে।
একাডেমিক আর্কাইভ।
ধর্মীয় নয় - ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে রাখা।
সে পড়তে শুরু করে।
প্রথম আয়াত যেটায় তার চোখ আটকায় -
"আমি কি তোমাদের জিজ্ঞেস করিনি, হে আদম সন্তান -
শয়তানের উপাসনা করো না?
নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
আর আমার ইবাদত করো।
এটাই সরল পথ।"
রহমান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার চোখ নড়ে না।
এই কথাগুলো ১৬০০ বছর আগে লেখা।
কিন্তু মনে হচ্ছে - এই শহরের জন্যই লেখা।
এই সময়ের জন্যই লেখা।
তার জন্যই লেখা।
তার চোখ ভিজে আসে।
সে বুঝতে পারে না কেন।
কিন্তু ভিজে আসে।
পরদিন সকালে সে আবার যায় সেই পুরনো টানেলে আস-সিরাতে।
মুনিরকে খোঁজে।
মুনির ছিল।
রহমানকে দেখে শুধু একটু হাসে।
"জানতাম তুমি আসবে। তবে এতদিন পর?"
"কীভাবে?"
"যাদের ডাক পড়ে, তারা একবার না একবার ফেরে।"
রহমান বসে পড়ে।
"মুনির, আমি কুরআন পড়েছি।
একটু।
কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না -
এত বছর পরেও এই কথাগুলো কেন এত জীবন্ত লাগছে?"
মুনির বলে,
"কারণ এটা মানুষের কথা নয়।
মানুষের কথা পুরনো হয়।
আল্লাহর কথা পুরনো হয় না।"
রহমান চুপ করে থাকে।
"কিন্তু এই শহরে কেউ বিশ্বাস করে না।
প্রমাণ চাই।
আমিও চাই।
আমাকে প্রমাণ দাও।"
মুনির হাসে।
"তোমার হৃদয় এখন কাঁপছে।
এটাই প্রথম প্রমাণ।
পাথর কাঁপে না।"
শাইখ খালিদ সেদিনও ছিলেন।
রহমানকে দেখে বলেন,
"এসো পুত্র।
তোমার চোখ বলছে তুমি এবার সত্যিকারের প্রশ্ন নিয়ে এসেছ।"
রহমান বলে,
"শাইখ, এই শহরের মানুষ বলে -
বিজ্ঞান সব প্রশ্নের উত্তর দেয়।
আল্লাহর দরকার নেই।
আমি কীভাবে তাদের বোঝাব?"
শাইখ মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবেন।
তারপর বলেন,
"তাদের জিজ্ঞেস করো -
এই মহাবিশ্বে এত নিয়ম কে বানিয়েছে?
আলোর গতি কেন সবসময় একই?
পানির অণু কেন এভাবেই তৈরি যে জীবন সম্ভব?
পৃথিবী সূর্য থেকে ঠিক এতটুকু দূরে কেন - একটু বেশি হলে জমে যেত, একটু কম হলে পুড়ে যেত?
এই সব কি কাকতালীয়?
বিজ্ঞান বলে "কীভাবে"।
কিন্তু "কেন" - এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের কাছে নেই।
সেই 'কেন'-এর উত্তর আল্লাহর কাছে।"
রহমান শুনতে থাকে।
মনোযোগ দিয়ে।
এত মনোযোগ দিয়ে সে আগে কখনো কিছু শোনেনি।
কয়েক সপ্তাহ পরে।
নিও-জেডার সবচেয়ে বড় পাবলিক ফোরাম - "ওপেনমাইন্ড আরেনা।"
সেখানে প্রতি সপ্তাহে একটা ডিবেট হয়।
যেকোনো বিষয়ে।
সেদিনের বিষয় - "ডাজ কন্সিয়াসনেস প্রুভ গড?"
ড্যান টেম্পার সেখানে বক্তা।
বিশাল অডিটোরিয়াম।
হাজার মানুষ।
রহমান পেছনে বসে ছিল।
শুনছিল।
ড্যান বলছিল,
"চেতনা মস্তিষ্কের একটা কার্যক্রম।
যখন মস্তিষ্ক বন্ধ, চেতনাও বন্ধ।
এখানে ঈশ্বরের কোনো জায়গা নেই।"
দর্শক হাততালি দেয়।
রহমান উঠে দাঁড়ায়।
পেছন থেকে।
"একটা প্রশ্ন করতে পারি?"
সবাই তাকায়।
ড্যান হাসে।
"অফকোর্স।"
"আপনি বললেন চেতনা মস্তিষ্কের কার্যক্রম।
কিন্তু মস্তিষ্ক তো শুধু বায়োলজিক্যাল টিস্যু।
টিস্যু থেকে 'অনুভব' কীভাবে আসে?
আপনি ব্যথা অনুভব করেন।
সেই অনুভবটা কোথায় থাকে?
কোন অ্যাটমে?
কোন নিউরনে?"
ড্যান একটু থামে।
"এটা এখনো গবেষণার বিষয়।"
"মানে উত্তর নেই?"
"মানে উত্তর এখনো আসেনি।"
"ঠিক আছে।
আপনি বললেন মস্তিষ্ক বন্ধ হলে চেতনা বন্ধ।
কিন্তু নিয়ার-ডেথ এক্সপেরিয়েন্স-এর ক্ষেত্রে কী বলবেন?
যেখানে মস্তিষ্কের কোনো কার্যক্রম নেই,
তবু মানুষ দেখতে পাচ্ছে, শুনতে পাচ্ছে,
পরে সেটা সঠিকভাবে বলতে পারছে?
এই ডেটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?"
অডিটোরিয়ামে একটু গুঞ্জন।
ড্যান বলে,
"এগুলো আনেকডোটাল।"
"না, এগুলো ডকুমেন্টেড মেডিকেল ক্লাসেস।
২০০০ সালের আগেও।
এখনো।
আপনি আনেকডোটাল বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন কারণ এটা আপনার তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।
কিন্তু বিজ্ঞান কি এভাবে কাজ করে?
বিজ্ঞান কি অস্বস্তিকর ডেটা উপেক্ষা করে?"
ড্যান কিছু বলে না।
রহমান বসে পড়ে।
পেছন থেকে কেউ একজন ফিসফিস করে,
"এই ছেলেটা কে?"
পরদিন রহমানের প্রোফাইলে একটা নোটিফিকেশন আসে।
"ইওর সোশ্যাল ট্রাস্ট র‍্যাঙ্ক হ্যাজ বিন ডাউনগ্রেডেড: এ১ টু এ২।
রিজন: এক্সপ্রেশন অফ ফেইথ-আড্জাসেন্ট আইডিওলজিস।"
সে স্ক্রিনের দিকে তাকায়।
তারপর হাসে।
প্রথমবার - সত্যিকারের হাসি।
"তারা ভয় পেয়েছে।"
কিন্তু এই হাসি বেশিক্ষণ থাকে না।
পরের সপ্তাহে তার স্পন্সর জেনেটেক চুক্তি বাতিল করে।
কোনো কারণ দেখায় না।
শুধু একটা মেসেজ -
"উই আর মুভিং ইন আ ডিফারেন্ট ডিরেকশন।"
মান্নান ছুটে আসে।
"ভাই, তুই কী করলি?
জেনেটেকের চুক্তি গেলে তোর ইনকামের ৪০ ভাগ গেল।"
রহমান শান্ত।
"জানি।"
"তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?
একটা ডিবেটে দুইটা প্রশ্ন করলি,
আর সব শেষ?"
"মান্নান, তুই কি জানিস আমার বাবাকে কেন নিয়ে গিয়েছিল?"
মান্নান চুপ করে যায়।
"শুধু কথা বলেছিলেন।
শুধু সত্যের কথা বলেছিলেন।
তার জন্য তাকে মুছে ফেলা হয়েছে।
আর আমি দুটো প্রশ্ন করে ঘাবড়ে যাব?"
মান্নান দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
"তুই কোথায় যাচ্ছিস রে ভাই?"
রহমান তার দিকে তাকায়।
"আমি জানি না।
কিন্তু এইবার আমি সেখানে যাচ্ছি যেখানে যাওয়া দরকার।"
কয়েকদিন পরে জিংকা তার কাছে আসে।
চোখে ভয়।
"রহমান, তোর নামে একটা ফাইল খোলা হয়েছে।
'সাইকোলজিক্যাল মনিটরিং - লেভেল ২।'
তারা তোর কথাবার্তা রেকর্ড করছে।
তুই সাবধান হ।"
রহমান বলে,
"তুই আমাকে সাবধান করতে এসেছিস?"
"হ্যাঁ।"
"কেন?"
জিংকা কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর বলে,
"কারণ... তুই যা বলছিস সেই ডিবেটে -
সেটা আমিও ভেবেছিলাম।
কিন্তু ভয়ে বলিনি।
তুই বলেছিস।"
রহমান তার দিকে তাকায়।
"তোর বাপ-দাদা কোথা থেকে এসেছিল?"
"পুরোনো বাংলাদেশ, অনেক আগে।"
"তারা কি মুসলিম ছিল?"
চোখ নামিয়ে বলে।
"ছিল।"
"তুমি জানো তাহলে।
ভুলে গেছ।
কিন্তু জানো।"
জিংকা চলে যায়।
কিন্তু যাওয়ার আগে একটু দাঁড়ায়।
পেছন ফিরে বলে,
"সাবধানে থাকিস।"
সেই রাতে রহমান একা।
তার ঘরে কোনো হলোগ্রাম নেই।
কোনো মিউজিক নেই।
সে মেঝেতে বসে পড়ে।
তার মনে পড়ে শাইখ খালিদের কথা -
"তুমি যখন দোয়া করো - আল্লাহ, আমাকে পথ দেখাও -
তুমি তখনই পবিত্র হয়ে যাচ্ছো।"
সে হাত তোলে।
কাঁপা কাঁপা।
জীবনে প্রথমবার।
নিজে থেকে।
কেউ দেখছে না।
কেউ শুনছে না।
সে ফিসফিস করে বলে,
"আল্লাহ...
আমি জানি না তুমি আছ কিনা।
কিন্তু যদি থাকো -
আমার বাবা যদি সত্যের জন্য গিয়ে থাকে -
তাহলে সেই সত্যটা আমাকে দেখাও।
আমি ভয় পাচ্ছি।
কিন্তু পালাতে চাই না।"
ঘরে নিঃশব্দতা।
কিন্তু সেই নিঃশব্দতার মধ্যে কোথাও একটা উষ্ণতা আছে।
অদ্ভুত।
অব্যাখ্যাত।
যেন কেউ শুনছে।
পরদিন ভোরে সে আবার যায় 'আস-সিরাত'-এ।
শাইখ খালিদ তাকে দেখে বলেন,
"তোমার চোখ আজ অন্যরকম।"
"কাল রাতে... আমি দোয়া করেছি।
জীবনে প্রথমবার।"
শাইখ চোখ বন্ধ করেন।
ঠোঁটে হাসি।
"সুবহানাল্লাহ।
আল্লাহ তোমাকে ডেকেছিলেন।
তুমি সাড়া দিয়েছ।
এটাই শুরু।"
"কিন্তু শাইখ, আমি এখনো অনেক কিছু জানি না।
নামাজ পড়তে জানি না।
অনেক কিছু জানি না।"
"জানার দরকার নেই সব একসাথে।
একটাই দরকার - তুমি কি সত্য চাও?
বাকি সব আসবে।"
সপ্তাহ দুয়েক পরে।
রহমান আর গোপনে নয়।
সে খোলামেলা প্রশ্ন করছে।
সোশ্যাল ফিডে লিখছে।
একটা পোস্ট করে -
"এই শহরে সবকিছু আছে।
শুধু নেই -
উত্তর।
কেন আমরা আছি?
কেন এই মহাবিশ্ব আছে?
কেন চেতনা আছে?
বিজ্ঞান বলে "কীভাবে"।
কিন্তু "কেন" - এটা কেউ বলতে পারে না।
আমি খুঁজছি।"
পোস্টটা ভাইরাল হয়।
কিন্তু দুইভাবে।
একদল বলে - "রাফি পাগল হয়ে গেছে।"
আরেকদল বলে - "এই প্রশ্ন আমিও করেছিলাম একদিন।"
সেই দ্বিতীয় দলের মানুষগুলো রহমানকে মেসেজ করে।
একে একে।
চুপিচুপি।
"আমার দাদি নামাজ পড়তেন। আমি কি জানতে পারি কেন?"
"আমার বাবার কাছে একটা পুরনো বই ছিল। আরবিতে লেখা। সেটা কী?"
"আমিও স্বপ্নে একটা আলো দেখি। এর মানে কী?"
রহমান বুঝতে পারে -
এই শহরে ধর্ম মরেনি।
শুধু ভয়ে লুকিয়ে আছে।
কিন্তু শহর চুপ থাকে না।
একদিন সকালে রহমানের দরজায় দুজন লোক।
সিটি মনিটরিং ইউনিট।
"আব্দুর রহমান?
আপনার সোশ্যাল কন্টেন্ট রিভিউ করা হচ্ছে।
আমাদের সাথে আসুন।"
রহমান তাদের দিকে তাকায়।
বুকে ভয়।
কিন্তু পা সরে না।
"কোন আইনে?"
"সাইকোলজিক্যাল স্টাবিলিটি অ্যাক্ট, সেকশন ৭।
যে কন্টেন্ট নাগরিকদের মানসিক স্থিতি অস্থির করে,
তা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার রাষ্ট্রের আছে।"
রহমান বলে,
"আমি প্রশ্ন করেছি।
প্রশ্ন করা কি অস্থিরতা?"
"আপনার প্রশ্নগুলো ধর্মীয় ভাবাদর্শ প্রচারের সাথে সম্পর্কিত।"
"ধর্মীয় ভাবাদর্শ প্রচার করিনি।
আমি দার্শনিক প্রশ্ন করেছি।
দর্শন কি নিষিদ্ধ?"
লোক দুটো একে অপরের দিকে তাকায়।
"আপনাকে একটা কাউন্সেলিং সেশন-এ যেতে হবে।"
"বাধ্যতামূলক?"
"হ্যাঁ।"
রহমান কোট তুলে নেয়।
"চলুন।"
কাউন্সেলিং সেন্টার - সাদা দেয়াল, নরম আলো।
একজন থেরাপিস্ট বসে আছেন।
নাম ড. লিরা।
মিষ্টি গলায় বলেন,
"বসুন রহমান।
আমরা আপনার ব্যাপারে চিন্তিত।"
"কেন?"
"আপনি কিছু এমন প্রশ্ন করছেন যা মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করছে।"
"সত্যের প্রশ্ন কি অস্থিরতা?"
ড. লিরা হাসেন।
"দেখুন, আমরা জানি আপনার বাবার বিষয়টা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে।
এই ধরনের ট্রমা থেকে মানুষ কখনো কখনো পুরনো বিশ্বাসের দিকে ফিরে যায়।
এটা স্বাভাবিক।
কিন্তু এটা একটা মানসিক প্রতিক্রিয়া।
বাস্তবতা নয়।"
রহমান বলে,
"আপনি বলছেন আমার বিশ্বাস ট্রমার ফল।
কিন্তু আপনার অবিশ্বাসও কি ট্রমার ফল হতে পারে না?
যে মানুষ কখনো ভালোবাসা পায়নি,
সে কি ভালোবাসাকে মিথ্যা বলে না?
আপনারা কি কখনো ধর্ম থেকে আঘাত পেয়েছেন,
তাই ধর্মকে মুছে ফেলেছেন?"
ড. লিরা থামেন।
"এটা ভিন্ন বিষয়।"
"না, একই বিষয়।
আপনি বলছেন আমার বিশ্বাস আবেগনির্ভর।
আমি বলছি আপনার অবিশ্বাসও আবেগনির্ভর।
দুজনেই তাহলে একই অবস্থানে।
কিন্তু তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায় -
সত্যটা কী?"
ড. লিরা সেশন শেষ করেন।
রেকর্ডে লেখেন - "সাবজেক্ট শোজ রেজিস্টেন্ট টু কারেকশন।"
রহমান বেরিয়ে আসে।
রোদে দাঁড়ায়।
বুক ভরে শ্বাস নেয়।
সে জানে - এই শহর তাকে ছাড়বে না সহজে।
কিন্তু সে-ও আর থামবে না।
সেই সন্ধ্যায় মান্নান আসে।
এবার তার চোখে রসিকতা নেই।
"ভাই, তোকে কাউন্সেলিং-এ নিয়ে গিয়েছিল?"
"হ্যাঁ।"
"তুই কি বললি?"
রহমান বলে।
মান্নান চুপ করে শোনে।
শেষে বলে,
"তুই কি সত্যিই বিশ্বাস করিস?
মানে, আল্লাহ আছেন?"
রহমান কিছুক্ষণ থামে।
"আমি এখনো সব নিশ্চিত না।
কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত -
এই শহর যত মরিয়া হয়ে উঠছে প্রশ্নটা থামাতে,
সত্যটা ততই বড় হচ্ছে মনে।
মিথ্যাকে কেউ এত ভয় পায় না।"
মান্নান দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর আস্তে বলে,
"আমার দাদি একটা কথা বলতেন -
'বজ্র পড়ার আগে আকাশ চুপ হয়ে যায়।'
তখন বুঝিনি।
এখন মনে হচ্ছে বুঝতে পারছি।"
রহমান তার দিকে তাকায়।
মান্নানের চোখে এমন কিছু আছে
যা আগে কখনো দেখেনি।
একটা ফাটল।
যে ফাটল দিয়ে আলো ঢুকতে পারে।

পর্ব ৭

মান্নানের চোখের সেই ফাটলটা রহমান ভুলতে পারে না।
সেই রাতে ঘুমাতে পারে না সে।
বারবার মনে হয় -
সে একা নয়।
এই শহরে আরো অনেকে আছে
যারা ভেতরে ভেতরে খুঁজছে,
কিন্তু মুখ খুলতে পারছে না।
ভয়। সবার ভয়।
কিন্তু ভয়ের নিচে চাপা পড়া একটা তৃষ্ণা আছে।
সেই তৃষ্ণাটাই আসল।
পরদিন সকালে রহমান 'আস-সিরাত'-এ যায়।
শাইখ খালিদের সামনে বসে।
"শাইখ, আমি বুঝতে পারছি এই শহরে অনেকে আছে
যারা খুঁজছে কিন্তু পাচ্ছে না।
আমি কি তাদের কাছে যেতে পারি?"
শাইখ বলেন,
"যেতে পারো।
কিন্তু আগে নিজেকে তৈরি করো।
যে নিজে দাঁড়াতে পারে না,
সে অন্যকে দাঁড় করাবে কীভাবে?"
"আমাকে কী শিখতে হবে?"
"প্রথমে নামাজ।
এটা শুধু অনুষ্ঠান নয় -
এটা প্রতিদিন পাঁচবার নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া যে তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছ।
এই শহরে মানুষ সবকিছু ভুলে যায়।
নামাজ ভুলতে দেয় না।"
রহমান মাথা নাড়ে। সেদিন থেকে শুরু হয়। টলতে টলতে। ভুল করতে করতে। কিন্তু প্রতিদিন।
কয়েকদিন পরে।
কোয়েল - বাংলার বংশধর, যে বলত "বাংলা ইজ ডেড" -
সে একদিন রহমানকে একা পেয়ে থামায়।
"তোর সাথে একটু কথা বলব।"
"বল।"
"তুই সেদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলি আমার পূর্বপুরুষ কোথা থেকে।
আমি সব বলিনি।
কিন্তু... আমার দাদার নাম ছিল আব্দুল কাদির।"
রহমান চুপ করে শোনে।
"অনেক আগে।
তার কাছে একটা বই ছিল।
সবুজ মলাটের।
ছোটবেলায় দেখেছিলাম।
কী বই জানতাম না।
পরে জেনেছি - কুরআন।
কিন্তু সেটা কোথায় গেছে জানি না।
সিস্টেম একবার আমাদের বাসা স্ক্যান করেছিল।
তারপর থেকে বইটা নেই।"
কোয়েলের গলা কাঁপছে।
"আমি... আমি জানতে চাই সেই বইয়ে কী ছিল।"
রহমান তার দিকে তাকায়।
"আমার সাথে আসবে একদিন?"
"কোথায়?"
"যেখানে এখনো সেই বই পড়া হয়।"
তিনদিন পরে কোয়েলকে নিয়ে যায় 'আস-সিরাত'-এ।
কোয়েল সেই টানেলে ঢুকে থমকে যায়।
মোমবাতির আলোয় মানুষ বসে আছে।
কেউ পড়ছে। কেউ শুনছে।
একটা বাচ্চা আরবি হরফ লিখছে।
কোয়েলের চোখে জল আসে।
কেন আসে সে জানে না।
শাইখ খালিদ তার দিকে তাকান।
"তোমার দাদার নাম কী ছিল?"
"আব্দুল কাদির।"
শাইখ চোখ বন্ধ করেন।
"আব্দুল কাদির - আল্লাহর শক্তিমান বান্দা।
তোমার দাদা তোমাকে ছেড়ে যাননি।
তার নামের অর্থটাই তোমার কাছে পাঠিয়েছেন।"
কোয়েল হাত দিয়ে মুখ ঢাকে।
কাঁদে।
নিঃশব্দে।
একমাস পরে।
নিও-জেডার সবচেয়ে বড় বার্ষিক ইভেন্ট -
"হিউম্যানিটি ফরওয়ার্ড সামিট।"
এখানে শহরের সেরা চিন্তকরা আসেন।
বিষয় - "দ্য ফিউচার অফ হিউম্যান পারপাস।"
লুকাস মর্গ্যান বক্তৃতা দিচ্ছেন।
তার বিষয় - "পারপাস উইদাউট গড: হাউ অ্যালগরিদম ডিফাইনস মিনিং।"
রহমান দর্শকের মাঝে।
তার পাশে মান্নান।
একটু দূরে কোয়েল।
লুকাস বলছেন,
"মানুষ একসময় ঈশ্বরের কাছ থেকে উদ্দেশ্য খুঁজত।
এখন আমরা জানি - উদ্দেশ্য নির্মাণ করতে হয়।
এআই আমাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে।
আমরা নিজেরাই আমাদের অর্থ তৈরি করব।"
হাততালি।
রহমান উঠে দাঁড়ায়।
"একটা প্রশ্ন।"
লুকাস তাকায়।
"হ্যাঁ।"
"আপনি বললেন উদ্দেশ্য নির্মাণ করতে হয়।
কিন্তু নির্মিত উদ্দেশ্য কি সত্যিকারের উদ্দেশ্য?
যদি আমি আজ সিদ্ধান্ত নিই যে আমার উদ্দেশ্য হবে
শুধু আনন্দ করা -
সেটা কি ঠিক?
আর যদি আরেকজন সিদ্ধান্ত নেয় তার উদ্দেশ্য হবে
অন্যকে কষ্ট দেওয়া -
সেটাও কি সমান বৈধ?
কারণ দুজনেই তো নিজের উদ্দেশ্য নিজে নির্মাণ করেছে।"
অডিটোরিয়ামে একটা নড়াচড়া।
লুকাস বলেন,
"সামাজিক চুক্তি আছে।
আইন আছে।"
"আইন কে বানায়?
ক্ষমতাশালীরা।
ইতিহাস দেখুন -
যখন ক্ষমতাশালীরা আইন বানিয়েছে ঈশ্বর ছাড়া,
তখন কী হয়েছে?
হিটলার তার উদ্দেশ্য নিজে নির্মাণ করেছিল।
স্তালিন করেছিল।
তারা কি ভুল ছিল আপনার তত্ত্ব অনুযায়ী?
কারণ তারাও তো নিজেদের অ্যালগরিদম ফলো করেছিল।"
লুকাস থামেন।
"এটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।"
"না, এটাই মূল প্রসঙ্গ।
ঈশ্বর ছাড়া নৈতিকতার ভিত্তি কোথায়?
আপনি বলবেন বিবর্তন।
কিন্তু বিবর্তন বলে শুধু টিকে থাকার কথা।
দুর্বলকে সাহায্য করা বিবর্তনের নিয়ম নয় -
বরং দুর্বলকে বাদ দেওয়াই বিবর্তনের নিয়ম।
তাহলে আপনার নৈতিকতা কি বিবর্তনবিরোধী?
নাকি আপনি অন্য কোথাও থেকে ধার করছেন?
সেই 'অন্য কোথাও' কোথায়?"
পুরো অডিটোরিয়াম চুপ।
লুকাস উত্তর দিতে পারেন না।
রহমান বসে পড়ে।
তার বুক কাঁপছে।
কিন্তু কণ্ঠ ছিল স্থির।
সেই রাতে মান্নান বলে,
"ভাই, তুই কোথা থেকে এইসব শিখলি?"
"শাইখ খালিদের কাছ থেকে কিছু।
বাকিটা নিজে ভেবেছি।
আর পড়েছি।"
"তোকে দেখে... আমার মনে হচ্ছিল এটাই ঠিক।
কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি।"
"কিসের ভয়?"
মান্নান চুপ করে থাকে।
তারপর বলে,
"যদি সত্যিই আল্লাহ থাকেন -
আমি তো অনেক কিছু করেছি।
অনেক কিছু।
সেটার কী হবে?"
রহমান তার দিকে তাকায়।
"শাইখ একটা কথা বলেছিলেন।
আল্লাহর রহমত তার রাগের চেয়ে বড়।
যে ফিরে আসতে চায়, তার জন্য দরজা বন্ধ হয় না।
কখনো না।"
মান্নানের চোখ ভিজে যায়।
সে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কিন্তু রহমান দেখতে পায়।
শহর শুধু চাপ দিয়ে থামে না।
সামিট-এর তিনদিন পরে।
রহমানের নামে একটা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে শহরের সব স্ক্রিনে।
সেখানে দেখা যাচ্ছে - "রহমান" একটা ক্লাবে বসে বলছে,
"ধর্ম মানুষকে দুর্বল করে।
মুক্তি চাইলে সব বিশ্বাস ছেড়ে দিতে হবে।"
কিন্তু এটা ডিপফেক।
তার মুখ, কিন্তু তার কথা নয়।
একদিনেই ভিডিওটা লক্ষ মানুষ দেখে।
কমেন্টে লেখা -
"দেখেছ? সে নিজেই বলছে ধর্ম মিথ্যা।"
"এতদিন ধরে ভান করছিল।"
"আসল চেহারা বেরিয়ে এসেছে।"
রহমান স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে।
মান্নান ছুটে আসে।
"ভাই, এইটা তুই বলিসনি, তাই না?"
"না।"
"কিন্তু সবাই দেখছে।"
"জানি।"
"কী করবি?"
রহমান একটু থামে।
তারপর বলে,
"সত্যটা বলব।
সরাসরি।"
"সবাই বিশ্বাস করবে না।"
"যারা বিশ্বাস করার তারা করবে।
যারা করবে না, তাদের জন্য আমি কিছু করতে পারব না।
কিন্তু আমি চুপ থাকব না।"
সে সেদিনই একটা লাইভে আসে।
"এই ভিডিও ডিপফেক।
আমি এই কথা বলিনি।
এটা বানানো হয়েছে আমাকে থামাতে।
কিন্তু আমি তোমাদের একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই -
কেন আমাকে থামানো দরকার?
কারণ আমি প্রশ্ন করছি।
শুধু প্রশ্ন।
যে সত্য সত্য, সে প্রশ্নকে ভয় পায় না।
কিন্তু মিথ্যা সবসময় প্রশ্নকে ভয় পায়।
তোমরা নিজেরাই ভাব -
এই শহরে প্রশ্ন করলে কেন শাস্তি দেওয়া হয়?"
লাইভে হাজার হাজার মানুষ।
কমেন্ট ভেসে আসছে।
কিছু গালি।
কিছু হুমকি।
কিন্তু আরো অনেক কিছু -
"তুমি ঠিকই বলছ।"
"আমিও এই প্রশ্ন করেছিলাম।"
"আমার মা মুসলিম ছিলেন। আমি জানতে চাই।"
কিন্তু এর পরের দিনগুলো কঠিন।
জিনো তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়।
আয়া ব্লক করে দেয়।
পুরনো স্পন্সরদের দরজা বন্ধ।
শহরের হাই-প্রোফাইল ইভেন্টে আর ডাক আসে না।
রহমান প্রায় একা।
একদিন রাতে সে ছাদে বসে।
একা।
শহরের আলো নিচে জ্বলছে।
কৃত্রিম। ঠান্ডা।
সে ভাবে -
এই কি সেই পথ?
এত কিছু ছেড়ে,
এত কিছু হারিয়ে?
তার মনে পড়ে বাবার কথা।
ফারুক আলী।
যিনি সব হারিয়েছিলেন।
বাড়ি, পরিচয়, নাম -
সব।
তবু সরেননি।
রহমান মাথা তোলে।
"আব্বু, তুমি একা পেরেছিলে।
আমিও পারব।"
সেই রাতেই মান্নান আসে।
হাতে কিছু নেই।
বোতল নেই।
ফোন নেই।
শুধু সে।
ছাদে এসে রহমানের পাশে বসে।
কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বলে,
"ভাই।"
"হুম।"
"আমি... আমি আস-সিরাতে গিয়েছিলাম।
একা।
তোকে না বলে।"
রহমান তাকায়।
"শাইখ খালিদের সাথে কথা বলেছি।
অনেকক্ষণ।
তিনি বললেন -
'তুমি যদি সত্যিকারের ফিরতে চাও,
আল্লাহ তোমাকে ফেরাবেন।
কিন্তু প্রথম পদক্ষেপটা তোমাকেই নিতে হবে।'"
রহমান কিছু বলে না।
মান্নান বলে,
"আমি কালাম পড়েছি।
মানে, তারা পড়ে শুনিয়েছেন।
প্রথম সূরা।
সাতটা আয়াত।
ভাই -"
সে থামে।
"আমার মনে হয়েছে এই কথাগুলো আমার জন্যই লেখা।
'আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি,
শুধু তোমার কাছেই সাহায্য চাই।'
আমি কত জায়গায় সাহায্য চেয়েছি।
বোতলে। পার্টিতে। মানুষে।
কেউ দেয়নি।
এই একটা লাইন পড়েই মনে হলো -
এখানে চাইলে পাওয়া যাবে।"
রহমানের চোখ ভিজে যায়।
দুই বন্ধু পাশাপাশি বসে।
নিচে শহর জ্বলছে।
ওপরে কৃত্রিম আকাশ।
কিন্তু তাদের দুজনের বুকের ভেতর
এই প্রথম একটা সত্যিকারের আলো জ্বলছে।
মাস দুয়েক পরে।
রহমান এখন নিয়মিত কথা বলছে।
বড় মঞ্চে নয় -
ছোট ছোট জায়গায়।
কফি শপে।
পার্কের বেঞ্চে।
অনলাইনে।
একদিন বিশজন।
পরদিন পঞ্চাশজন।
তারপর একশো।
তারা সবাই একই রকম মানুষ -
যাদের বাবা-দাদার নামে আরবি শব্দ আছে
কিন্তু মানে জানে না,
যাদের ঘরে একসময় নামাজ হতো
কিন্তু এখন হয় না,
যারা রাতে একা থাকলে
অদ্ভুত একটা শূন্যতা অনুভব করে
কিন্তু কাকে বলবে জানে না।
রহমান তাদের বলে -
"আমিও তোমাদের মতোই ছিলাম।
এখনো সব জানি না।
কিন্তু একটা জিনিস জানি -
এই শূন্যতাটা আসলে একটা সংকেত।
এটা বলছে - তুমি এর চেয়ে বেশি কিছুর জন্য তৈরি।"
শহরের সিস্টেম এটা দেখছে।
রহমানের সোশ্যাল ট্রাস্ট র‍্যাঙ্ক আরো নামে।
বি১ থেকে সি৩।
একদিন তাকে আবার ডাকা হয়।
এবার কাউন্সেলিং নয় -
সরাসরি সিটি অথরিটি।
একজন কর্মকর্তা।
মুখে হাসি।
কিন্তু চোখে ঠান্ডা।
"রহমান, তুমি মেধাবী।
তোমার মতো মানুষকে আমরা হারাতে চাই না।
আমরা তোমাকে একটা প্রস্তাব দিতে চাই।
তুমি এই 'ধর্মীয় অনুসন্ধান' বন্ধ করো।
বিনিময়ে তোমার সব হারানো র‌্যাংক ফিরিয়ে দেব।
স্পন্সর ফিরিয়ে দেব।
তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে।"
রহমান কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
"আর যদি না করি?"
কর্মকর্তার হাসি একটু পরিবর্তন হয়।
"তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।
তুমি নিজেই বুঝতে পারছ।"
রহমান উঠে দাঁড়ায়।
"আমার বাবাকেও এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল?
তিনিও না বলেছিলেন?
তাহলে আমার উত্তরও একই।"
সে বেরিয়ে আসে।
বাইরে রোদ নেই।
কৃত্রিম আলো।
কিন্তু রহমানের পায়ের নিচে মাটি শক্ত।
সেই রাতে সে যায় শাইখ খালিদের কাছে।
শাইখ তাকে দেখে বলেন,
"তুমি আজ অনেক কঠিন একটা জায়গা পার হয়েছ।"
"আপনি জানেন?"
"আমি জানি না।
কিন্তু তোমার চোখ বলছে।"
রহমান বসে পড়ে।
"শাইখ, আমি ভয় পাচ্ছি না।
কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় -
এই লড়াইয়ের শেষ কোথায়?"
শাইখ হাসেন।
"লড়াইয়ের শেষ নেই পুত্র।
কিন্তু একটা মোড় আছে।
যেখানে পৌঁছালে তুমি বুঝবে -
তুমি একা লড়ছিলে না।
কখনোই না।"
"মোড়টা কোথায়?"
"সেটা আল্লাহ জানেন।
আমরা শুধু হাঁটি।"
শাইখ একটু থামেন।
তারপর বলেন,
"রহমান, তোমাকে একটা কথা বলি।
তোমার বাবা -
মাওলানা ফারুক আলী -
তিনি যখন যাচ্ছিলেন,
আমি সেখানে ছিলাম।"
রহমান চমকে ওঠে।
"আপনি?"
"হ্যাঁ।
তিনি যাওয়ার আগে একটাই কথা বলেছিলেন -
'আমার ছেলে একদিন আসবে।
তাকে বলো - সত্য কখনো মরে না।
শুধু সময় নেয়।'"
রহমান নিঃশব্দে কাঁদে।
শাইখ তার মাথায় হাত রাখেন।
"তোমার বাবা জানতেন।
তোমার জন্মের আগেই জানতেন।
এই পথ তোমার জন্য আঁকা ছিল।"
পরদিন সকাল।
রহমান প্রথমবার ফজরের নামাজ পড়ে।
একা।
তার ছোট্ট ঘরে।
মেঝেতে
একটা পুরনো কাপড় বিছিয়ে।
কাঁপা কাঁপা উচ্চারণে।
ভুল হয়তো অনেক।
কিন্তু মন পরিষ্কার।
সে সিজদায় যায়।
কপাল মাটিতে।
আর তখন -
সেই অদ্ভুত উষ্ণতা আবার আসে।
সেই অনুভব,
যা প্রথম রাতে দোয়া করার সময় পেয়েছিল।
যেন কেউ বলছে -
"তুমি ঠিক জায়গায় এসেছ।"
রহমান সিজদা থেকে ওঠে না অনেকক্ষণ।
শহর বাইরে জেগে উঠছে।
কৃত্রিম আলোয়।
ডিজিটাল শোরগোলে।
কিন্তু এই ছোট্ট ঘরের ভেতর
একটা সত্যিকারের ভোর হচ্ছে।
আব্দুর রহমান জানে -
এখন শুধু শুরু।
সামনে আরো অনেক পথ।
আরো অনেক ঝড়।
কিন্তু এই প্রথম -
সে জানে কোথায় যাচ্ছে।

পর্ব ৮

ফজরের পর থেকে রহমানের জীবন দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে।
বাইরে - শহর তাকে চাপ দিচ্ছে।
ভেতরে - কিছু একটা প্রতিদিন শক্ত হচ্ছে।
সিটি অথরিটি-র প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর
তার বিরুদ্ধে আরো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তার বাসার নিচে সবসময় একটা মনিটরিং ড্রোন।
তার ফোনের মেসেজ স্ক্যান হচ্ছে।
যে যে মানুষ তার সাথে কথা বলছে
তাদেরও সতর্ক করা হচ্ছে।
একদিন কোয়েল ছুটে আসে।
"রহমান, আমার অফিস থেকে বলেছে -
তোর সাথে যোগাযোগ রাখলে আমার চাকরি যাবে।"
রহমান বলে,
"তাহলে যোগাযোগ রেখো না।
তোমার ক্ষতি আমি চাই না।"
কোয়েল কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
"কিন্তু আমি যদি চাই?"
"তাহলে জেনে রেখো -
এই পথে সুবিধা নেই।
শুধু সত্য আছে।"
কোয়েল মাথা নাড়ে।
"সত্যটাই আমার দরকার।
চাকরি আবার হবে।
কিন্তু এই জিনিস -
এই যে বুকের ভেতর শান্তি পাচ্ছি -
এটা অন্য কোথাও পাইনি।"
মান্নানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা।
তার স্ট্রিট-সোশ্যাল ডিলার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়।
সিস্টেম বলে - "সাসপিশাস বিহেভিয়ারাল প্যাটার্ন ডিটেক্টেড।"
মান্নান একদিন রাতে আসে।
মুখ শুকনো।
"ভাই, আমার সব গেছে।
নেটওয়ার্ক গেছে।
টাকা গেছে।
মানুষ সরে গেছে।"
রহমান তার পাশে বসে।
"কেমন লাগছে?"
মান্নান একটু ভাবে।
"আশ্চর্যের বিষয় হলো -
এত হারানোর পরেও আমি ভেঙে পড়িনি।
আগে কম হারালেও রাত কাটত না।
এখন... কেমন জানি একটা স্থিরতা আছে।"
রহমান হাসে।
"এটাই ঈমানের প্রথম স্বাদ।"
মান্নান হাসে।
প্রথমবার - সত্যিকারের হাসি।
নেশার হাসি নয়।
ভেতর থেকে আসা হাসি।
দুমাস পরে।
ড্যান টেম্পার একটা বড় ইভেন্ট ডাকেন।
বিষয় - "দ্য ডেথ অফ গড: আ ফাইনাল ভার্ডিক্ট।"
এটা আসলে রহমানকে লক্ষ্য করেই।
ড্যান চান সবার সামনে তাকে থামিয়ে দিতে।
ইভেন্টের আগের দিন রহমানের কাছে একটা আমন্ত্রণ আসে।
"আপনাকে বিপক্ষ দলে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।"
রহমান যায়।
বিশাল হলঘর।
হাজার তিনেক মানুষ।
আরো লাখখানেক অনলাইনে।
ড্যান টেম্পার মঞ্চে।
রহমান বিপরীত দিকে।
ড্যান শুরু করেন।
"আমরা আজ এখানে এসেছি একটা সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে -
ঈশ্বর কি আছেন?
বিজ্ঞান বলে - নেই।
ইতিহাস বলে - মানুষ নিজের দুর্বলতা থেকে ঈশ্বর তৈরি করেছে।
আর আমার সামনে যে বসে আছেন -
তিনি দাবি করছেন ঈশ্বর আছেন।
আসুন দেখি তিনি কী বলেন।"
রহমান উঠে দাঁড়ায়।
"ধন্যবাদ।
আমি প্রথমে একটা কথা বলতে চাই -
আমি এখানে কাউকে হারাতে আসিনি।
আমি এসেছি কথা বলতে।
কারণ সত্যের কথা বলার জায়গা থাকা দরকার।
আপনি বললেন বিজ্ঞান বলে ঈশ্বর নেই।
কিন্তু বিজ্ঞান কি আসলে এটা বলে?
বিজ্ঞান পরীক্ষানিরীক্ষার পদ্ধতি।
যা পরিমাপ করা যায়, বিজ্ঞান তা নিয়ে কথা বলে।
ঈশ্বর পরিমাপযোগ্য নন।
তাহলে বিজ্ঞান কীভাবে বলবে ঈশ্বর নেই?
এটা বিজ্ঞানের সীমানা লঙ্ঘন।
একজন সৎ বিজ্ঞানী বলবেন -
'আমরা জানি না।'
শুধু একজন অসৎ আদর্শবাদী বলবেন -
'ঈশ্বর নেই।'"
ড্যান বলেন,
"কিন্তু ঈশ্বরের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই।"
"প্রমাণ না থাকা মানে অস্তিত্ব না থাকা নয়।
আপনি কি মাধ্যাকর্ষণ দেখেছেন?
না।
কিন্তু তার প্রভাব দেখেছেন।
আপনি কি ভালোবাসা দেখেছেন?
না।
কিন্তু তার অনুভব পেয়েছেন।
অদৃশ্য জিনিস কি মিথ্যা?
এই মহাবিশ্বের দিকে তাকান।
১৩.৮ বিলিয়ন বছরের ইতিহাস।
অগণিত গ্যালাক্সি।
প্রতিটি পদার্থ কণা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলছে।
পদার্থবিদরা বলেন - এই নিয়মগুলো একটু অন্যরকম হলে
মহাবিশ্ব টিকত না।
জীবন সম্ভব হতো না।
এই 'ঠিক ঠিক' পরিমাণটা কি কাকতালীয়?
গণিত বলে -
এত নিখুঁত সামঞ্জস্য দৈবাৎ হওয়ার সম্ভাবনা
শূন্যের এত কাছাকাছি যে সংখ্যায় লিখলে কাগজ শেষ হয়ে যাবে।"
ড্যান বলেন,
"মাল্টিভার্স থিওরি বলে হয়তো অসংখ্য মহাবিশ্ব আছে।
আমাদেরটা ঘটনাচক্রে জীবনসম্ভব হয়েছে।"
রহমান হাসেন।
"মাল্টিভার্স থিওরি এখন পর্যন্ত প্রমাণিত নয়।
এটা একটা অনুমান।
আপনি একটা অপ্রমাণিত অনুমান দিয়ে
একটা জীবন্ত প্রশ্নকে উড়িয়ে দিতে চাইছেন।
আর আমি প্রমাণ চাইলে বলছেন নেই।
কিন্তু নিজে অপ্রমাণিত জিনিস বিশ্বাস করছেন।
তাহলে পার্থক্য কোথায়?
আমি বিশ্বাস করি - এই মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা আছেন।
আপনি বিশ্বাস করেন - নেই।
দুজনেই বিশ্বাস করছি।
কিন্তু আমার বিশ্বাসের পেছনে
এই অসম্ভব নিখুঁত মহাবিশ্ব আছে।
আপনার বিশ্বাসের পেছনে কী আছে?"
অডিটোরিয়ামে পিনপতন নীরবতা।
ড্যান একটু থামেন।
তারপর বলেন,
"তুমি আবেগ থেকে কথা বলছ।"
"না।
আমি যুক্তি থেকে কথা বলছি।
আবেগ থেকে কথা বলছেন আপনি।
কারণ ঈশ্বরের ধারণা আপনার জীবনকে অস্বস্তিকর করে দেয়।
যদি ঈশ্বর থাকেন -
তাহলে আপনি তার সামনে দায়বদ্ধ।
সেই দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতেই
মানুষ ঈশ্বরকে মুছে ফেলতে চায়।
এটা বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত নয় -
এটা মানসিক পলায়ন।"
ড্যান টেম্পার চুপ হয়ে যান।
হলঘরে একটা শব্দ উঠে আসে।
হাততালি নয় -
একটা গভীর গুঞ্জন।
যেন হাজার মানুষের মনে একসাথে একটা প্রশ্ন জেগে উঠেছে।
ইভেন্টের পর রহমান বেরিয়ে আসে।
বাইরে অনেক মানুষ।
কেউ কেউ কাছে আসে।
চুপিচুপি।
"তুমি যা বললে - আমি আগে এই কথা কোথাও পাইনি।"
"আমার বাবা মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন আল্লাহর কথা। আমি হেসেছিলাম। আজ বুঝলাম বাবা ভুল ছিলেন না।"
"আমাকে কুরআন পড়তে সাহায্য করবে?"
রহমান প্রতিটা মানুষকে সময় দেয়।
নাম লেখে।
কথা বলে।
মান্নান পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে।
চোখ ভেজা।
পরে বলে,
"ভাই, আজকে যা দেখলাম -
এই মানুষগুলোর চোখে যা দেখলাম -
এটা অন্যরকম।
পার্টিতে মানুষ হাসে।
কিন্তু এই হাসি আলাদা।"
রহমান বলে,
"এটা সেই হাসি, তৃষ্ণা মিটলে যে হাসি আসে।"
তিনমাস পরে।
'আস-সিরাত' এখন আর শুধু সেই ছোট্ট টানেল নয়।
মানুষ বেড়েছে।
নানা বয়সের।
নানা পেশার।
একজন ডাক্তার আসেন -
যিনি একদিন রহমানের বিতর্ক অনলাইনে দেখেছিলেন।
একজন তরুণ প্রকৌশলী -
যার দাদি মৃত্যুর আগে কালিমা পড়েছিলেন,
সে সেটা মনে রেখেছিল।
একজন মধ্যবয়সী নারী -
যে নিজেও জানত না সে মুসলিম বংশের,
যতদিন না পুরনো পারিবারিক ডেটাবেসে নাম খুঁজে পায়।
শাইখ খালিদ এদের দেখেন।
চোখে আনন্দ আর অশ্রু একসাথে।
একদিন রহমানকে ডাকেন।
"পুত্র, তুমি কি জানো এখন কতজন এখানে আসছে?"
"গুনিনি।"
"আমি গুনেছি।
একশো সাতষট্টি জন।
এক বছর আগে ছিল বারোজন।"
রহমান চুপ করে থাকে।
"এটা তোমার কাজ নয়।
এটা আল্লাহর কাজ।
তুমি শুধু পথ হয়েছ।"
কিন্তু শহর এতে ক্ষান্ত হয় না।
একদিন সকালে খবর আসে -
শাইখ খালিদকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অভিযোগ - "আনঅথরাইজড রিলিজিয়াস অ্যাসেম্বলি।
সাইকোলজিক্যাল ডিস্টেবিলাইজেশন অফ সিটিজেন্স।"
রহমান ছুটে যায়।
কিন্তু আস-সিরাতের দরজা বন্ধ।
সিল করা হয়েছে।
বাইরে মনিটরিং বট।
সে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিছুক্ষণ।
তার মনে পড়ে সেই রাতের কথা -
যেদিন ছাদে একা বসেছিল
আর মনে মনে বলেছিল -
"আব্বু, তুমি একা পেরেছিলে। আমিও পারব।"
সে ফোন তোলে।
মান্নানকে ডাকে।
কোয়েলকে ডাকে।
আরো যারা আছে তাদের।
তারা আসে।
একে একে।
রহমান বলে,
"শাইখকে নিয়ে গেছে।
আস-সিরাত বন্ধ করেছে।
কিন্তু তারা একটা জিনিস বন্ধ করতে পারেনি।
আমাদের বুকের ভেতরের আস-সিরাত।
সেটা কেউ সিল করতে পারে না।"
মান্নান বলে,
"এখন কী করব?"
"যা শিখেছি - বলতে থাকব।
যেখানে পারি।
যখন পারি।
তারা একটা জায়গা বন্ধ করেছে।
আমরা সব জায়গা খুলব।"
সেই সন্ধ্যায় রহমান রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলে।
কোনো মঞ্চ নেই।
কোনো মাইক নেই।
শুধু সে আর পথচলা মানুষ।
"তোমাদের একটু সময় দেবে?
একটাই প্রশ্ন -
তোমার জীবনে কি কখনো মনে হয়েছে যা দেখছ
এর চেয়ে বেশি কিছু আছে?
এই পার্টি, এই স্কোর, এই র‌্যাংক -
এর বাইরে কিছু?"
মানুষ থামে।
কেউ চলে যায়।
কেউ দাঁড়ায়।
যারা দাঁড়ায় - তাদের চোখে সেই পরিচিত তৃষ্ণা।
রহমান তাদের সাথে কথা বলে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
রাত হয়।
তবু থামে না।
মান্নান পাশে দাঁড়িয়ে।
কোয়েল পাশে দাঁড়িয়ে।
আরো কয়েকজন।
তারা একটা ছোট্ট দল।
কিন্তু দৃঢ়।
দুসপ্তাহ পরে।
শাইখ খালিদের কাছ থেকে একটা চিঠি আসে।
কাগজে লেখা।
হাতে।
পুরনো নিয়মে।
"রহমান,
আমি ভালো আছি।
তারা আমাকে বলেছে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে।
আমি বলেছি - আল্লাহর পথে যার সাথে সম্পর্ক হয়,
সেটা ছিন্ন করার ক্ষমতা মানুষের নেই।
তোমাকে একটা কথা বলি -
তোমার বাবা যখন যাচ্ছিলেন,
তিনি একটা কথা বলেছিলেন যা আমি তোমাকে আগে বলিনি।
তিনি বলেছিলেন -
'এই লড়াই শেষ হবে।
একদিন এই শহরে আবার আযান শোনা যাবে।
আমি সেদিন না থাকলেও থাকব।'
আমি জানি না সেদিন কবে।
কিন্তু তুমি যা করছ দেখে মনে হচ্ছে -
সেদিন বেশি দূরে নয়।
আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করুন।
খালিদ।"
রহমান চিঠিটা বুকের কাছে ধরে।
চোখ বন্ধ করে।
"আব্বু,
তুমি বলেছিলে একদিন আযান শোনা যাবে।
আমি শুনব।
আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।"
মাস কয়েক কেটে যায়।
রহমানদের ছোট্ট দল এখন আর ছোট্ট নেই।
শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।
গোপনে।
কিন্তু সংগঠিত।
তারা পড়াশোনা করে।
কুরআনের অর্থ শেখে।
প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে।
একে অপরকে শেখায়।
শহরের সিস্টেম জানে।
এরা আইন ভাঙছে না।
হিংসা করছে না।
শুধু কথা বলছে।
শুধু প্রশ্ন করছে।
শুধু বিশ্বাস করছে।
আর এই 'শুধু'টাই সিস্টেমের সবচেয়ে বড় ভয়।
একদিন রাতে রহমান একা হাঁটছে।
শহরের সেই পুরনো রাস্তা -
যেখানে প্রথমবার দেয়ালে লেখা দেখেছিল -
"তুমি যদি সত্য চাও, তবে সাহস রেখো।"
সে সেই জায়গায় আসে।
দেয়ালটা এখনো আছে।
কিন্তু সেই লেখা মুছে গেছে।
কেউ মুছে দিয়েছে।
রহমান থামে।
তারপর ধীরে ধীরে
নিজের আঙুল দিয়ে সেই মুছে যাওয়া জায়গায় লেখে -
"সত্য মুছে যায় না।
শুধু সময় নেয়।"
সে আবার হাঁটতে শুরু করে।
রাতের শহর তার চারপাশে।
কৃত্রিম আলো।
ডিজিটাল শোরগোল।
মানুষের ভিড়।
কিন্তু রহমানের বুকে একটা আলো আছে
যেটা এই শহরের কোনো সিস্টেম নেভাতে পারেনি।
আর সে জানে -
এই আলো একা জ্বলছে না।
শহরের বিভিন্ন কোণে
আরো অনেক আলো জ্বলছে।
ছোট।
কিন্তু জীবন্ত।
আর ছোট ছোট আলো একসাথে হলে
অন্ধকার টিকতে পারে না।
পরদিন সকালে।
রহমান কফি বানাচ্ছে।
দরজায় টোকা।
দরজা খুলে অবাক হয়।
জিংকা।
চোখে ক্লান্তি।
কিন্তু মুখে একটা সংকল্প।
"ভেতরে আসতে পারি?"
"এসো।"
সে বসে।
কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বলে,
"আমার দাদির নাম ছিল রহিমা।
মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন -
'আল্লাহকে ভুলিস না।'
আমি সেদিন হেসেছিলাম।
আজ সেই কথাটা মাথা থেকে যাচ্ছে না।"
রহমান চুপ করে শোনে।
"তুমি কি আমাকে শেখাবে?
আমি জানতে চাই।
সত্যিকারভাবে।"
রহমান একটু হাসে।
"তোমার দাদি তোমাকে ছেড়ে যাননি।
এতদিন পরেও তার কথা তোমার কাছে এসেছে।
এটাই প্রমাণ।"
জিংকা-র চোখ ভিজে আসে।
"প্রমাণ?"
"আল্লাহ ভুলে যাওয়া মানুষকেও ভোলেন না।"
সেই সপ্তাহেই রহমানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা হয়।
"পাবলিক অর্ডার ডিসরাপশন।
ফেইথ-বেসড র‌্যাডিক্যালাইজেশন।
আনঅথরাইজড অ্যাসেম্বলি কোঅর্ডিনেশন।"
সে নিজেই সিটি কোর্ট-এ যায়।
কোনো উকিল নেই।
একা।
বিচারক বলেন,
"আপনার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ।
আপনি কি নিজেকে দোষী মনে করেন?"
রহমান বলে,
"না।
আমি প্রশ্ন করেছি।
মানুষের সাথে কথা বলেছি।
বিশ্বাস করেছি।
এর কোনটা অপরাধ?"
"আপনি নাগরিকদের মানসিক স্থিতি অস্থির করেছেন।"
"না।
আমি নাগরিকদের মনে একটা প্রশ্ন জাগিয়েছি।
প্রশ্ন কি অস্থিরতা?
নাকি প্রশ্ন আসলে সততার লক্ষণ?
যে মানুষ প্রশ্ন করে না সে কি সত্যিই স্থির,
নাকি সে শুধু চুপ করে আছে?"
আদালতে শুনশান।
বিচারক বলেন,
"আপনাকে ছয় মাসের কমিউনিটি রিহ্যাবিলিটেশন-এ পাঠানো হবে।
সেখানে আপনার 'বিশ্বাস পুনর্বিন্যাস' করা হবে।"
রহমান মাথা তোলে।
"আমার বাবাকেও এই পথে নেওয়া হয়েছিল।
আমি যাব।
কিন্তু আমার বিশ্বাস আমার বুকে।
সেখানে আপনাদের হাত পৌঁছাবে না।"
রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার।
সাদা ঘর।
নরম আলো।
প্রতিদিন সেশন।
ড. লিরা আবার।
"রহমান, আমরা চাই তুমি ভালো থাকো।"
"আমি ভালো আছি।"
"তোমার বিশ্বাস তোমাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে।"
"না।
আমার বিশ্বাস আমাকে সত্যিকারের মানুষের সাথে যুক্ত করছে।"
"কিন্তু এই বিশ্বাস বৈজ্ঞানিকভাবে অপ্রমাণিত।"
"ভালোবাসা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত?
মর্যাদা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত?
ন্যায়বিচার বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত?
আপনি এগুলো বিশ্বাস করেন কি না?"
ড. লিরা থামেন।
"সেগুলো ভিন্ন।"
"কীভাবে ভিন্ন?
আপনি বলুন।"
ড. লিরা উত্তর দিতে পারেন না।
সেশন শেষ হয়।
রহমান তার ছোট্ট ঘরে ফিরে যায়।
মেঝেতে বসে।
নামাজ পড়ে।
রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার-এর সাদা দেয়ালের মধ্যে।
প্রতিদিন।
পাঁচবার।
তারা তার শরীর আটকে রেখেছে।
কিন্তু তার সিজদা আটকাতে পারেনি।
ছয় মাস পরে।
রহমান বের হয়ে আসে।
শহর একটু বদলেছে।
তার অনুপস্থিতিতে।
তার কথাগুলো ছড়িয়ে পড়েছে আরো।
মান্নান, কোয়েল, জিংকা -
তারা থামেনি।
আর একটা জিনিস বদলেছে।
ড. লিরা -
যিনি প্রতিদিন রহমানের সাথে তর্ক করতেন -
তিনি পদত্যাগ করেছেন।
কারণ হিসেবে লিখেছেন -
"আই ক্যান নো লঙ্গার ওয়ার্ক ফর আ সিস্টেম দ্যাট ফিয়ারস কোয়েশ্চেনস।"
রহমান এই খবর শুনে চুপ করে থাকে।
তারপর বলে,
"আল্লাহ কাকে কোথা থেকে ডাকেন,
সেটা কেউ জানে না।"
রহমান বের হওয়ার প্রথম রাতে
সে যায় সেই পুরনো মসজিদের কাছে।
যেটা এখন বন্ধ।
মিউজিয়াম হয়ে গেছে।
সে দরজার বাইরে দাঁড়ায়।
চোখ বন্ধ করে।
তার মনে পড়ে নববর্ষের রাতে
এখানেই এসেছিল সে।
মাটিতে বসে দোয়া করেছিল।
দূরে শহরের আলো জ্বলছে।
কৃত্রিম।
কিন্তু সেই আলোর মাঝে
ছোট ছোট জানালায়
সত্যিকারের আলো জ্বলছে।
মানুষ পড়ছে।
মানুষ শিখছে।
মানুষ ফিরছে।
রহমান দাঁড়িয়ে থাকে।
বাতাস আসে।
আর সেই বাতাসে -
অনেক দূর থেকে -
একটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।
পরিচিত।
অনেক পরিচিত।
"রহমান।"
সে চমকে ওঠে।
চারদিকে তাকায়।
কেউ নেই।
কিন্তু কণ্ঠটা ছিল।
সে শুনেছে।
তার বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে।
সে ফিসফিস করে বলে,
"আব্বু?"
বাতাস থেমে যায়।
রাত নিঃশব্দ।
কিন্তু সেই নিঃশব্দতার মধ্যে
একটা উত্তর আছে।
শব্দহীন।
কিন্তু স্পষ্ট।
"আমি আসছি।"

পর্ব ৯

রাতটা দীর্ঘ।
রহমান মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। বাতাস আর আসে না। সেই কণ্ঠ আর শোনা যায় না। কিন্তু বুকের ভেতর যে কম্পনটা হয়েছে সেটা যাচ্ছে না।
সে ঘরে ফেরে। মেঝেতে বসে। হাত তোলে।
আল্লাহ, আমি জানি না কী শুনলাম। কিন্তু যা-ই হোক - তুমি জানো। আমার বাবা কোথায় আছেন তুমি জানো। তাকে ভালো রেখো। আর যদি তোমার ইচ্ছা থাকে - একদিন তার সাথে দেখা করিয়ে দিও।
সে সিজদায় যায়। কপাল মেঝেতে। অনেকক্ষণ।
পরদিন সকালে। রহমান বের হয় নতুন শক্তি নিয়ে। পুনর্বাসন থেকে বেরিয়ে এসে প্রথম দিন। শহরের বাতাস একই। কৃত্রিম। কিন্তু তার নিঃশ্বাস অন্যরকম।
মান্নান অপেক্ষায় ছিল। পাশে কোয়েল। পাশে জিনো। আরো কয়েকজন।
রহমান তাদের দেখে। তোরা কেউ ছেড়ে যাসনি।
মান্নান বলে, তুই গেলে আমরা যাই কোথায়? তুই ছাড়া তো আমরা আবার হারিয়ে যাব।
রহমান মাথা নাড়ে। না। তোরা আর হারাবি না। কারণ তোরা এখন জানিস কোথায় ফিরতে হয়।
কোয়েল বলে, ছয় মাসে অনেক কিছু হয়েছে। আরো মানুষ যোগ হয়েছে। কিন্তু সিস্টেমও আরো কড়া হয়েছে।
কতটা কড়া?
শহরের যেকোনো জায়গায় পাঁচজনের বেশি একসাথে কথা বললে এখন অটোমেটিক মনিটরিং শুরু হয়। আল্লাহ শব্দটা কেউ বললে সাথে সাথে লোকেশন ট্র্যাক হয়।
রহমান শোনে। চুপ করে।
তারপর বলে, তারা একটা শব্দকে এত ভয় পাচ্ছে। এই শব্দটা কতটা শক্তিশালী ভাব।
সপ্তাহখানেক পরে।
অ্যাভা রিন - সেই কনটেন্ট থেরাপিস্ট - একটা লাইভ সেশন ডাকেন। বিষয় - বিশ্বাস কেন মানসিক অসুস্থতা।
রহমান অনলাইনে যোগ দেয়। কমেন্টে।
অ্যাভা বলছেন, মানুষ যখন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে তখন একটা কাল্পনিক শক্তির আশ্রয় নেয়। এটা মানসিক দুর্বলতার প্রকাশ। থেরাপি দিয়ে এটা সারানো যায়।
রহমান লেখে, আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?
অ্যাভা দেখেন। একটু থামেন। তারপর বলেন, অবশ্যই। রহমান - আমাদের বিখ্যাত বিশ্বাসী।
লাইভে তাকে ডাকেন।
রহমান বলে, আপনি বললেন বিশ্বাস মানসিক দুর্বলতা। কিন্তু গবেষণা কী বলে? দুই হাজার সালের আগে থেকে হওয়া অসংখ্য মেডিকেল স্টাডি দেখায় - যারা বিশ্বাস রাখেন, তারা মানসিক চাপে বেশি স্থির থাকেন। বিষণ্নতায় কম ভোগেন। কঠিন রোগের সামনে বেশি দৃঢ় থাকেন। এই ডেটা কি আপনি দেখেছেন?
অ্যাভা বলেন, সেগুলো পুরনো গবেষণা।
পুরনো মানে ভুল নয়। আপনি বললেন বিশ্বাস দুর্বলতা। কিন্তু আমি নিজে দেখেছি - এই শহরে যারা সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছে তারা কি বিশ্বাসী ছিল? নাকি যারা সব পেয়েও শূন্য ছিল তারা বিশ্বাসহীন ছিল?
আপনার ক্লায়েন্টরা কি সুখী? তারা কি সত্যিকারের শান্তি পেয়েছে নাকি সাময়িক রিলিফ পেয়েছে?
অ্যাভা থামেন।
লাইভের কমেন্টে ভেসে আসে - সে ঠিকই বলছে। আমি থেরাপি করেছি। শান্তি পাইনি। আমার মা বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি সবচেয়ে শান্তিতে মরেছেন।
অ্যাভা লাইভ শেষ করেন।
কিন্তু সেই লাইভের ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। লাখো মানুষ দেখে।
তিনদিন পরে।
অ্যাভা রিন রহমানকে ব্যক্তিগত বার্তা পাঠান।
তোমার সাথে কথা বলতে চাই। সবার সামনে নয়। একা।
রহমান যায়।
অ্যাভা একটা ছোট্ট ক্যাফেতে বসে আছেন। চোখে ক্লান্তি।
তুমি আমাকে কোণঠাসা করেছিলে।
না। আমি প্রশ্ন করেছিলাম।
একই কথা।
চুপচাপ।
তারপর অ্যাভা বলেন, আমার মা মারা গিয়েছিলেন যখন আমার বয়স বারো। তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। খুব। মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন - ভয় নেই। আল্লাহ আছেন। আমি তখন ভেবেছিলাম এটা দুর্বলতা। একটা মৃত্যুভয় কমানোর কৌশল।
কিন্তু তার চোখে ভয় ছিল না। সত্যিকারের ভয় ছিল না। আমি অনেকদিন এটা ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি।
রহমান চুপ করে শোনে।
তুমি যখন লাইভে বললে - যারা বিশ্বাস রাখেন তারা মানসিক চাপে বেশি স্থির থাকেন - আমার মায়ের মুখ মনে পড়ল।
দীর্ঘ নীরবতা।
রহমান আস্তে বলে, আপনার মা যা বলেছিলেন - সেটা কৌশল ছিল না। সেটা ছিল সত্যিকারের বিশ্বাস। আর সত্যিকারের বিশ্বাস মৃত্যুকেও হালকা করে দেয়।
অ্যাভার চোখ ভিজে আসে। তিনি মুখ ফেরান।
আমি কোথা থেকে শুরু করব?
আপনার মায়ের কথা থেকে। তিনি যা বিশ্বাস করতেন - সেটা কী ছিল। সেখান থেকে শুরু করুন।
মাস তিনেক পরে।
শহরে একটা কানাকানি চলছে।
শুনেছ, রহমানের দলে এখন নাকি পাঁচশোর বেশি মানুষ। না, হাজারের বেশি। অ্যাভা রিন নাকি ছেড়ে দিয়েছেন থেরাপিস্টের কাজ। ডক্টর লিরা নাকি নিজেই প্রশ্ন করছেন।
সিস্টেম অস্থির।
নেভি - সেই কর্পোরেট সিইও - জরুরি বৈঠক ডাকেন।
এই রহমানকে থামাতে হবে। সে এখন শুধু প্রশ্ন করছে না। সে একটা আন্দোলন তৈরি করছে। আমাদের পুরো সিস্টেমের ভিত্তিতে আঘাত করছে।
একজন পরামর্শদাতা বলেন, তাকে আবার গ্রেফতার করি?
নেভি বলেন, না। গ্রেফতার করলে তার বিশ্বাস যে, সে শহীদ হয়ে যাবে। তাকে হারাতে হবে অন্যভাবে। তার বিশ্বাসকে ভাঙতে হবে। তাকে এমন কিছু দেখাতে হবে যাতে সে নিজেই সন্দেহ করে।
কী দেখাব?
নেভি হাসেন। তার বাবা।
রাত দুটো।
রহমানের ফোনে একটা অজানা নম্বর।
সে তোলে।
রহমান।
কণ্ঠটা শুনে তার শরীর জমে যায়।
পুরুষ কণ্ঠ। বৃদ্ধ। ভাঙা কণ্ঠ। কিন্তু চেনা। কোথাও চেনা।
কে?
আমি... আমি তোমার বাবা।
রহমান বসে পড়ে। হাত কাঁপছে।
আব্বু?
হ্যাঁ। রহমান -
কণ্ঠটা ভাঙে।
আমি... আমি অনেকদিন বেঁচে আছি। তারা আমাকে রেখে দিয়েছিল। একটা ঘরে। একা। কিন্তু আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। তোমার কথা শুনতে পাচ্ছিলাম। তুমি যা করছ - পুত্র, তুমি ঠিক করছ। কিন্তু আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই -
হঠাৎ লাইন কেটে যায়।
রহমান বারবার কল করে। বন্ধ। নম্বর পাওয়া যাচ্ছে না।
সে সারারাত বসে থাকে। ঘুম হয় না।
ভোরে মান্নানকে ডাকে।
মান্নান, কাল রাতে আমার বাবার ফোন এসেছিল।
মান্নান চমকায়। কী বলছিস?
তিনি বেঁচে আছেন। তারা তাকে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু কথা শেষ করার আগেই লাইন কেটে গেছে।
মান্নান একটু ভাবে। ভাই, এটা কি সত্যি? নাকি...
নাকি কী?
নাকি ফাঁদ?
রহমান থামে।
সে জানে মান্নান ভুল বলেনি। নেভি তাকে থামাতে চায়। এই শহরে বিশ্বাসকে ভাঙতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো - যাকে ভালোবাসো তাকে ব্যবহার করো।
রহমান সেদিন একা যায় শাইখ খালিদের কাছে।
শাইখ এখনো বন্দী। কিন্তু তার সাথে দেখা করার অনুমতি আছে। মাসে একবার।
রহমান বসে।
শাইখ, আমার বাবার ফোন এসেছিল।
শাইখ চোখ তোলেন। কিছু বলেন না।
তিনি বললেন বেঁচে আছেন। কিন্তু লাইন কেটে গেছে। আমি জানি না সত্যি কিনা।
শাইখ বলেন, তুমি কী মনে করো?
আমি মনে করি হয়তো ফাঁদ। কিন্তু হয়তো সত্যিও। আমি বুঝতে পারছি না।
দুটো সম্ভাবনাই আছে। যদি ফাঁদ হয় - তাহলে তারা চাইছে তুমি তোমার বাবার আশায় কোথাও ছুটে যাও। গ্রেফতার হও। থেমে যাও।
যদি সত্যি হয় - তাহলে আল্লাহ সময় হলে দেখা করিয়ে দেবেন। তোমাকে ছুটতে হবে না।
তাহলে আমি কী করব?
শাইখ বলেন, যা করছিলে তাই করো। থামিও না। বিচলিত হইও না। তোমার বাবা যদি বেঁচে থাকেন - আল্লাহ তার হেফাজত করবেন। তোমার কাজ তোমার পথে থাকা।
রহমান মাথা নত করে।
আমার ভয় হচ্ছে শাইখ। এই প্রথম সত্যিকারের ভয় হচ্ছে।
কিসের ভয়?
যদি বাবা সত্যিই কোথাও বন্দী থাকেন - আর আমি কিছু না করি - তাহলে আমি কেমন ছেলে?
শাইখ একটু হাসেন। তুমি জানো না তোমার বাবা কেমন মানুষ ছিলেন। তিনি যখন যাচ্ছিলেন তখন তোমার কথা বলেননি। তোমার মায়ের কথা বলেননি। শুধু বলেছিলেন - সত্য কখনো মরে না।
একজন বাবা যখন নিজের সন্তানের চেয়ে সত্যকে বড় মনে করেন - তখন বুঝতে হবে তার ছেলেকেও সেই একই পথে হাঁটতে হবে। থেমে যাওয়া তোমার বাবার পরিচয় নয়। আর থেমে যাওয়া তোমার পরিচয়ও নয়।
রহমান চোখ মুছে। উঠে দাঁড়ায়।
দুসপ্তাহ পরে।
সেই অজানা নম্বর থেকে আবার ফোন।
এবার রহমান প্রস্তুত।
কে বলছেন?
আমি তোমার বাবা। রহমান, আমার কথা শোনো -
আপনি কোথায়?
শহরের পূর্ব প্রান্তে। একটা পুরনো ফ্যাসিলিটি। তুমি যদি আসো -
রহমান শান্ত গলায় বলে, আমি আসব না।
কণ্ঠটা থামে।
কী বললে?
আমি আসব না। কারণ আমার বাবা যদি সত্যিই এই ফোনে থাকতেন - তিনি আমাকে আসতে বলতেন না। তিনি বলতেন - থামিস না। চালিয়ে যা।
আপনি আমার বাবা নন। আপনি সেই মানুষ যে আমার বাবাকে নকল করে আমাকে থামাতে চাইছেন।
আমি বলতে চাই - এটা কাজ করবে না।
লাইন কেটে যায়।
রহমান ফোন রাখে। হাত কাঁপছে।
কিন্তু পা স্থির।
সেই ঘটনার পর শহরে কিছু একটা বদলায়।
নেভির পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে - এটা জানাজানি হয়। কেউ একজন ফাঁস করে দেয়। সেই পুরো ষড়যন্ত্রের কথা।
শহরের মানুষ দেখে।
যারা আগে রহমান সম্পর্কে সন্দিহান ছিল তারা বুঝতে পারে - এই ছেলেকে এতবার ভাঙার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু সে ভাঙেনি।
এই অটলতা - এটাই সবচেয়ে বড় যুক্তি।
নতুন মানুষ আসতে শুরু করে। আর আগের চেয়ে দ্রুত।
একদিন সন্ধ্যায়।
রহমান রাস্তায় হাঁটছিল। একজন অপরিচিত বৃদ্ধ তার পথ আটকায়।
তুমি কি রহমান?
হ্যাঁ।
বৃদ্ধের চোখে জল।
আমার নাম ইউসুফ। আমি এই শহরে পঞ্চাশ বছর ধরে আছি। কাউকে বলতে পারিনি। কিন্তু আমি মুসলিম। সব সময়। একা। গোপনে।
তোমাকে দেখে প্রথমবার মনে হলো - আর একা নই।
রহমান তার হাত ধরে।
কিছু বলে না। কিছু বলার দরকার নেই।
হাত ধরাটাই যথেষ্ট।
ফেব্রুয়ারি দুই হাজার সাতাশ। শাইখ খালিদ মুক্তি পান।
কারণ হিসেবে সিস্টেম বলে - প্রমাণ অপর্যাপ্ত চলমান আটকের জন্য।
কিন্তু আসল কারণ অন্য। শহরের ভেতর থেকে চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক মানুষ। অনেক কণ্ঠ।
শাইখ বেরিয়ে আসেন।
রহমান গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে। পাশে মান্নান। কোয়েল। জিনো। ইউসুফ। আরো অনেকে।
শাইখ রহমানকে দেখেন। হেঁটে আসেন। তার কাঁধে হাত রাখেন।
পুত্র।
শাইখ।
দুজন চুপ।
শাইখ বলেন, তুমি থামোনি।
আপনি বলেছিলেন থামতে নেই।
শাইখ হাসেন। আমি বলেছিলাম। কিন্তু না থামাটা তোমার। এটা তোমার নিজের।
একটা বিশাল মাঠ। আকাশ পরিষ্কার। সত্যিকারের আকাশ। কৃত্রিম নয়।
দূরে একটা মানুষ হাঁটছে। পেছন ফিরে।
রহমান ডাকে, আব্বু!
মানুষটা থামে। ধীরে ধীরে ঘোরে।
একটা মুখ। বৃদ্ধ। ক্লান্ত। কিন্তু চোখে অদ্ভুত আলো।
রহমান ছুটে যায়।
কিন্তু যত এগোয় মানুষটা তত দূরে।
তারপর মানুষটা হাত তোলে।
দূর থেকে বলে, সবর করো পুত্র। সময় হলে। আল্লাহর অনুমতিতে।
রহমান থামে।
বুকে একটা শান্তি নামে।
সে বোঝে। সময় হলে। তাড়া নেই। আল্লাহর পরিকল্পনাই উত্তম।
ঘুম ভাঙে। বুজতে পারে এটা স্বপ্ন।
রহমান জানালা খোলে।
বাইরে শহর জেগে উঠছে। ডিজিটাল শোরগোল। কৃত্রিম আলো।
কিন্তু সেই শহরের বুকে আজ কিছু একটা আছে যা আগে ছিল না।
একটা নড়াচড়া। একটা জাগরণ। ধীর। কিন্তু সত্যিকারের।
রহমান ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার অপেক্ষায় বসে।
তার মনে পড়ে সেই কবিতার লাইন - যেটা কোথা থেকে এসেছিল জানত না, কিন্তু বুকে লেখা ছিল সবসময় -
আমি বজ্র হয়ে দাঁড়াবো পথে, ভাঙিবো জুলুম জিও। আমি রক্ত ঢেলে আঁকিবো ইতিহাস, তুমি শুধু মোরে লিখে নিয়ো।
সে জানে - এই শপথ তার একার নয়। এই শপথ তার বাবার ছিল। এখন তার। একদিন হয়তো তার পরের প্রজন্মের।
কারণ বজ্র একবার পড়ে না। বজ্র বারবার পড়ে। যতদিন আকাশে মেঘ আছে। যতদিন পৃথিবীতে অন্যায় আছে। যতদিন মানুষের বুকে সত্যের তৃষ্ণা আছে।
ততদিন বজ্র পড়বেই।
আর রহমান সেই বজ্রের একটি ঝলক। শুধু একটি।
কিন্তু একটি ঝলকই যথেষ্ট অন্ধকার ভাঙতে।
পরদিন সকালে।
রহমান বের হয় শহরে।
আজ তার হাতে কিছু নেই। কোনো পরিকল্পনা নেই। কোনো বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট নেই।
শুধু সে। আর তার বিশ্বাস।
রাস্তায় মানুষ। ব্যস্ত। তাড়াহুড়া।
একটা ছেলে - বয়স বড়জোর পনেরো - রাস্তার পাশে একা বসে। মুখ নিচু।
রহমান থামে। পাশে বসে।
কী হয়েছে?
ছেলেটা তাকায়। চোখে একটা প্রশ্ন।
তুমি কি সেই রহমান? যে বলে আল্লাহ আছেন?
হ্যাঁ।
সত্যিই আছেন?
রহমান ছেলেটার দিকে তাকায়।
সে সেই চোখে দেখতে পায় নিজেকে। নিজের অতীতকে। শূন্য। তৃষ্ণার্ত। কিন্তু খুঁজছে।
রহমান বলে, আছেন। আমি জানি। কারণ আমি খুঁজেছিলাম। আর যে সত্যিকারভাবে খোঁজে - সে পায়।
ছেলেটা বলে, আমাকে শেখাবে?
রহমান উঠে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে দেয়।
চলো।
ছেলেটা হাত ধরে।
তারা দুজন হাঁটতে শুরু করে।
শহরের ভেতর দিয়ে। কৃত্রিম আলোর মধ্য দিয়ে।
কিন্তু তাদের পায়ের নিচে যে পথ - সেটা সত্যিকারের।
আর সামনে যে গন্তব্য - সেটা কেউ মুছতে পারবে না।
কারণ সেই গন্তব্য লেখা আছে - মানুষের ফিতরাতে। সেই জন্মগত স্বভাবে। যেটা হাজার বছরের চাপেও মরে না। শুধু ঘুমিয়ে থাকে।
আর রহমান সেই ঘুমন্ত মানুষগুলোকে একে একে জাগিয়ে তুলছে।
এভাবেই। একজন একজন করে। একদিন একদিন করে।
বজ্রের শপথ পূরণ হচ্ছে। ধীরে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে।

পর্ব ১০

ছয় মাস কেটে গেছে।
রহমান প্রতিদিন বের হয়। প্রতিদিন কথা বলে। প্রতিদিন কাউকে না কাউকে হাত ধরে টেনে তোলে।
সংখ্যাটা এখন গোনা যায় না।
মান্নান একদিন বলে, ভাই, আমি হিসাব করার চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি। কারণ প্রতিদিন নতুন মুখ আসছে।
রহমান বলে, হিসাব করতে হবে না। আল্লাহর হিসাব আছে।
শহরের সিস্টেম এখন বিভ্রান্ত।
তারা ভেবেছিল একটা আন্দোলনকে একটা জায়গায় আটকে রাখা যায়। বন্ধ করা যায়। মুছে ফেলা যায়।
কিন্তু এটা এক জায়গায় নেই। এটা মানুষের বুকে। সেখানে কোনো বট পৌঁছাতে পারে না। কোনো সিল কাজ করে না।
নেভির বৈঠকে এখন শুধু চাপা উদ্বেগ।
এরা কোনো আইন ভাঙছে না। এরা কোনো হিংসা করছে না। এরা শুধু বিশ্বাস করছে।
তাহলে আমরা কী করব?
কেউ উত্তর দিতে পারে না।
কারণ সত্যের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কোনো অস্ত্র কাজ করে না।
একদিন রহমানের কাছে একটা চিঠি আসে।
ডক্টর লিরার।
রহমান, তুমি হয়তো জানো আমি পদত্যাগ করেছি। কারণটা তোমাকে বলতে চাই।
তুমি যখন পুনর্বাসনে ছিলে প্রতিদিন আমি তোমার সাথে তর্ক করতাম। প্রতিদিন তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দিতে। আমি ভাবতাম আমি জিতছি। কিন্তু রাতে ঘরে ফিরে ঘুমাতে পারতাম না।
একদিন রাতে আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম - আমি কি সত্যিই বিশ্বাস করি ঈশ্বর নেই? নাকি আমি শুধু চাকরি করছি?
সেই রাতে উত্তর পেলাম। আমি বিশ্বাস করতাম না। আমি ভয় পেতাম। ঈশ্বর থাকলে আমার জীবনের হিসাব দিতে হবে। সেই ভয় থেকে আমি বিশ্বাস না করার ভান করতাম।
তুমি আমাকে আয়না দেখিয়েছিলে। ধন্যবাদ।
আমি এখন খুঁজছি। তোমার মতো করে। ভয় কাটিয়ে।
লিরা।
রহমান চিঠিটা রাখে। চোখ বন্ধ করে।
আল্লাহ, তুমি কাকে কোথা থেকে ডাকো কেউ জানে না।
শহরে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
নেভির নতুন পরিকল্পনা।
প্রকল্প নীরবতা।
বিস্তারিত কেউ জানে না। কিন্তু যারা ভেতরে আছে তারা ফিসফিস করছে।
কোয়েল একদিন ছুটে আসে। রহমান, একটা খবর পেয়েছি। প্রকল্প নীরবতা মানে - শহরের সব নাগরিকের ব্রেনওয়েভ ডেটা সংগ্রহ করা হবে। যাদের ডেটায় ধর্মীয় চিন্তার প্যাটার্ন ধরা পড়বে তাদের বাধ্যতামূলক স্নায়বিক পুনরায় সেট করা হবে।
রহমান চুপ করে শোনে।
মানে?
মানে তারা সরাসরি মস্তিষ্কে ঢুকে বিশ্বাস মুছে দেবে।
ঘরে নীরবতা।
মান্নান বলে, এটা কি সম্ভব?
লুকাস মর্গ্যান এই প্রযুক্তি তৈরি করেছেন। তিনি দাবি করেছেন সম্ভব।
রহমান উঠে দাঁড়ায়। জানালার কাছে যায়। শহরের দিকে তাকায়।
অনেকক্ষণ চুপ।
তারপর বলে, তারা জানে না।
কী জানে না?
বিশ্বাস মস্তিষ্কে থাকে না। বিশ্বাস থাকে রুহে। সেখানে তাদের প্রযুক্তি পৌঁছাবে না।
কিন্তু এই খবর মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। সবাইকে জানতে হবে কী হতে চলেছে।
রহমান এবার একটা সিদ্ধান্ত নেয়।
সে একটা লাইভ করবে। সবচেয়ে বড়। সব প্ল্যাটফর্মে একসাথে।
মান্নান বলে, ভাই, এটা করলে তারা সাথে সাথে ব্লক করবে।
করবে। কিন্তু প্রথম কয়েক মিনিট করবে না। সেই কয়েক মিনিটেই লক্ষ মানুষ দেখবে। আর যা একবার মানুষের মনে ঢোকে তা আর মোছা যায় না।
সেই রাতে।
রহমান লাইভে আসে।
প্রথম মিনিটেই পঞ্চাশ হাজার। দুই মিনিটে দুই লাখ।
সে কথা বলে। শান্ত গলায়। স্পষ্ট।
এই শহরের মানুষেরা, তোমাদের কাছে একটা কথা বলতে চাই।
তোমাদের বিশ্বাস কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এবার সরাসরি। মস্তিষ্কে।
কিন্তু আমি তোমাদের একটা কথা বলি - হাজার বছরে কেউ পারেনি। এখনো পারবে না।
কারণ মানুষের ভেতর একটা জিনিস আছে যেটা কোনো প্রযুক্তি ছুঁতে পারে না। সেটা হলো ফিতরাত। জন্মগত সেই স্বভাব - যেটা বলে একজন স্রষ্টা আছেন। যেটা বলে জীবনের একটা অর্থ আছে। যেটা বলে মৃত্যুর পরেও কিছু আছে।
তারা এটা মুছতে পারবে না। কারণ এটা মস্তিষ্কে নেই। এটা রুহে। এটা আল্লাহর দেওয়া।
আর আল্লাহর দেওয়া জিনিস আল্লাহ ছাড়া কেউ নিতে পারে না।
পাঁচ মিনিটের মাথায় লাইভ ব্লক হয়।
কিন্তু ততক্ষণে বিশ লাখ মানুষ দেখেছে। ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছে। থামানো যাচ্ছে না।
পরদিন সকালে।
নেভির অফিসে জরুরি বৈঠক।
প্রকল্প নীরবতা স্থগিত রাখতে হবে।
কেন?
কারণ গতরাতের লাইভের পর শহরের এক তৃতীয়াংশ নাগরিক স্নায়বিক পুনরায় সেট এর বিরুদ্ধে আবেদন করেছে। এবং তাদের মধ্যে অনেকে যারা ধর্মীয় নয় - শুধু স্বাধীনতার প্রশ্নে।
আমরা যদি এখন এগোই শহর অস্থির হয়ে যাবে।
নেভি চুপ করে থাকেন।
তাহলে রহমানকে কীভাবে থামাব?
দীর্ঘ নীরবতা।
কেউ উত্তর দিতে পারে না।
সেই সপ্তাহে।
রহমান তার মায়ের কাছে যায়।
মা দরজা খুলে ছেলেকে দেখেন। চোখে অনেক কথা।
ভেতরে ঢোকে রহমান।
মা, আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।
বল।
আব্বুর কথা। সব কথা। যা এতদিন বলোনি।
মা কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর বসেন।
তোর বাবা শুধু ইমাম ছিলেন না। তিনি একটা কাজ করছিলেন। গোপনে। যে মানুষগুলো বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিল তাদের ধরে ধরে ফেরাচ্ছিলেন।
ঠিক তুমি যা করছ।
রহমান শোনে।
একদিন কেউ খবর দিয়ে দিল। ওই রাতেই তারা এলো। তোর বাবা যাওয়ার আগে শুধু বললেন - রহমান যেন জানে - সত্যের জন্য দাঁড়ানো মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
মায়ের গলা ভাঙে।
আমি তোকে এই কথা বলিনি। কারণ ভয় পেতাম। ভাবতাম তুই জানলে তুইও সেই পথে যাবি। কিন্তু তুই তো গেলিই। আল্লাহ তোকে নিজেই সেই পথে নিয়ে গেলেন।
রহমান মায়ের হাত ধরে।
মা, তুমি কি এখনো নামাজ পড়তে পারবে?
মা একটু থামেন। তারপর বলেন, আমি ভুলে গেছি।
আমি শেখাব।
মা তাকান। ছেলের চোখে।
সেখানে তার স্বামীর ছায়া দেখেন। একই আলো। একই দৃঢ়তা।
তিনি নিঃশব্দে কাঁদেন।
দুমাস পরে।
শহরের পূর্ব প্রান্তে সেই পুরনো মসজিদ - যেটা মিউজিয়াম হয়ে গেছে।
সেই মসজিদের ছাদে কেউ একজন উঠে গেছে।
ভোর হওয়ার আগে।
আর তারপর -
শহরের কৃত্রিম নীরবতা ভেঙে একটা কণ্ঠ ভেসে আসে।
কাঁপা কাঁপা। অনিশ্চিত। কিন্তু সত্যিকারের।
আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার।
শহরের সিস্টেম সাথে সাথে সতর্ক হয়। মনিটরিং বট ছুটে যায়।
কিন্তু ততক্ষণে -
শহরের শত শত জানালায় আলো জ্বলে উঠেছে।
মানুষ জেগে উঠেছে।
কেউ কেউ কাঁদছে। কেউ কেউ জানালা খুলে দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ বুকে হাত দিয়ে চুপ করে শুনছে।
কারণ এই শব্দ তারা আগে শোনেনি। কিন্তু চিনতে পারছে।
ফিতরাত চিনতে পারছে।
রহমান সেই আযান শুনে বিছানা থেকে উঠে বসে।
চোখে জল। বুকে কম্পন।
মান্নান পাশের ঘর থেকে ছুটে আসে। ভাই! শুনছিস?
শুনছি।
দুজন চুপ করে শোনে।
আযান শেষ হয়।
তারপর আবার নীরবতা।
কিন্তু এই নীরবতা আগের মতো নয়। এই নীরবতায় কিছু একটা বদলে গেছে।
মান্নান বলে, কে উঠেছিল?
জানি না। কিন্তু যে-ই হোক - সে আজ ইতিহাস বদলে দিয়েছে।
পরে জানা যায় -
সেই মানুষটির নাম ইউসুফ। সেই বৃদ্ধ। যে পঞ্চাশ বছর একা গোপনে বিশ্বাস বহন করেছিল।
সে বলেছে, মরার আগে একবার আযান দিতে চেয়েছিলাম। আজ মনে হলো সময় হয়েছে। যা হওয়ার হবে।
তাকে গ্রেফতার করা হয়।
কিন্তু শহরের মানুষ এবার ভিন্নভাবে সাড়া দেয়।
হাজার মানুষ সেই ডিটেনশন সেন্টারের বাইরে জমা হয়।
চুপচাপ। কিন্তু অটল।
সিস্টেম দেখে - এই মানুষগুলোকে ছত্রভঙ্গ করতে গেলে আরো বড় সমস্যা হবে।
ইউসুফকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পরদিন শাইখ খালিদ সবাইকে ডাকেন।
রহমান যায়। মান্নান যায়। কোয়েল যায়। জিনো যায়। ইউসুফ যায়। ডক্টর লিরা যায়। অ্যাভা যায়। আরো অনেকে।
শাইখ বলেন, তোমরা দেখছ কী হচ্ছে। একটু একটু করে আলো ফিরছে।
কিন্তু আমি তোমাদের একটা কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। এটা আমাদের কাজ নয়। আমরা শুধু পথ। আল্লাহ কাজ করছেন।
আমাদের কাজ একটাই - নিজেদের ঠিক রাখা। নিজেদের বিশ্বাস শক্ত রাখা। কারণ বাইরের লড়াই জেতার আগে ভেতরের লড়াই জিততে হবে।
রহমান বলে, শাইখ, আমার মনে হচ্ছে এখন আরো বড় কিছু হওয়ার সময় এসেছে।
কী?
এই শহরে একটা মসজিদ খুলতে হবে। সত্যিকারের। যেখানে মানুষ আসতে পারবে। প্রকাশ্যে। লুকিয়ে নয়।
ঘরে নীরবতা।
শাইখ রহমানের দিকে তাকান। অনেকক্ষণ।
তারপর বলেন, এটা বিপজ্জনক।
জানি।
তারা বন্ধ করে দেবে।
হয়তো। কিন্তু বন্ধ করতে যখন আসবে তখন পুরো শহর দেখবে। আর যখন মানুষ দেখে - তখন প্রশ্ন জাগে। আর প্রশ্ন একবার জাগলে থামানো যায় না।
শাইখ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
তোমার বাবার মতো কথা বলছ।
তিনি আমার বাবা।
শুক্রবার।
শহরের মাঝখানে সেই পুরনো মসজিদ - যেটা মিউজিয়াম হয়েছিল।
সেই দরজায় কেউ একটা কাগজ লাগিয়ে দেয়। সকালে মানুষ দেখতে পায়।
আজ জুমার নামাজ হবে। সবাই আসতে পারেন। মুসলিম। অমুসলিম। বিশ্বাসী। সন্দেহকারী। খোঁজে থাকা যে কেউ। আল্লাহর ঘরে সবার জায়গা আছে।
শহর উত্তেজিত।
সিস্টেম প্রস্তুত হয়। বট পাঠায়। কর্মকর্তা পাঠায়।
কিন্তু মানুষও আসে।
একজন দুজন করে। তারপর দশজন। তারপর একশো। তারপর হাজার।
মসজিদের ভেতরে জায়গা নেই। বাইরে মানুষ দাঁড়িয়ে। রাস্তায় মানুষ।
শাইখ খালিদ সামনে। রহমান পাশে।
জুমার খুতবা শুরু হয়।
শাইখের কণ্ঠ কাঁপছে। কিন্তু স্পষ্ট।
আলহামদুলিল্লাহ। এই শব্দ এই শহরে অনেক বছর পরে উচ্চারিত হলো।
প্রশংসা তার জন্য যিনি মৃতকে জীবিত করেন। যিনি হারানোকে ফিরিয়ে আনেন। যিনি অন্ধকারে আলো দেন।
মসজিদে কান্নার শব্দ।
মানুষ - যারা কখনো নামাজ দেখেনি - তারা দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
কেউ জানে না কেন কাঁদছে। কিন্তু ফিতরাত জানে।
নামাজ শেষে।
সিস্টেমের কর্মকর্তারা এগিয়ে আসে।
এটা অনুমোদিত নয়। এই জায়গা বন্ধ করা হবে।
রহমান এগিয়ে আসে।
কোন আইনে?
সর্বজনীন স্থান অননুমোদিত দখল আইন।
এটা মসজিদ। মসজিদ মুসলমানদের। এটা তাদের জায়গা।
এই শহরে ধর্মীয় মালিকানা স্বীকৃত নয়।
রহমান শান্ত। আপনারা বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন - আজকে এখানে যা হয়েছে তা এই শহরের ইতিহাসে লেখা হয়ে গেছে। কোনো সিস্টেম এটা মুছতে পারবে না। কারণ এটা এখন মানুষের মনে। আর মনে যা লেখা হয় - তা চিরকাল থাকে।
কর্মকর্তারা মসজিদ বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু বাইরে হাজার মানুষ। তারা যায় না। দাঁড়িয়ে থাকে।
চুপচাপ। কিন্তু অটল।
এই দৃশ্য শহরের সব স্ক্রিনে ছড়িয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ দেখে।
আর যারা দেখে তাদের মনে প্রশ্ন জাগে।
এরা কেন এখানে দাঁড়িয়ে? এরা কী চায়? আমি কি তাদের মতো কিছু চাই?
সেই রাতে নেভি একা বসে আছেন।
তার অফিসের জানালা দিয়ে শহরের আলো দেখা যাচ্ছে।
তার সহকারী বলে, আজকের ঘটনার পর শহরের ৪২ শতাংশ নাগরিক ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে আবেদন করেছে। এদের মধ্যে অর্ধেক নিজেরা ধর্মীয় নয়। শুধু স্বাধীনতার প্রশ্নে।
নেভি চুপ।
আপনি কী বলবেন?
নেভি জানালার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
তিনি ছোটবেলার একটা কথা মনে করেন। তার মা মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন - বাবা, কোনো প্রশ্নের উত্তর না পেলে চুপ করে থেকো। উত্তর আসবে।
মা বিশ্বাসী ছিলেন। নেভি হয়েছিলেন অবিশ্বাসী।
কিন্তু আজ রাতে মায়ের সেই কথাটা মাথায় ঘুরছে।
তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন।
প্রকল্প নীরবতা বাতিল করো।
সহকারী অবাক। কিন্তু -
বাতিল করো।
কেন করলেন তিনি নিজেও জানেন না। কিন্তু কোথাও একটা বলছে - এটাই ঠিক।
পরদিন সকালে রহমানের কাছে একটা অজানা চ্যানেলে বার্তা আসে।
প্রকল্প নীরবতা বাতিল হয়েছে। তুমি জিতেছ। কিন্তু আসল যুদ্ধ সামনে। প্রস্তুত থেকো।
পাঠানোর নাম নেই।
রহমান বার্তাটা পড়ে।
মান্নানকে দেখায়।
মান্নান বলে, কে পাঠিয়েছে?
জানি না। ভেতর থেকে কেউ। যে বুঝতে পেরেছে।
আসল যুদ্ধ সামনে মানে?
রহমান জানালার দিকে তাকায়।
মানে এটা শুধু শুরু। শহর বদলাচ্ছে। কিন্তু সত্যিকারের পরিবর্তন আসতে আরো সময় লাগবে। আরো কাজ করতে হবে। আরো মানুষকে ধরতে হবে।
মান্নান বলে, আমি আছি।
জানি।
কোয়েলও আছে।
জানি।
আরো অনেকে আছে।
হ্যাঁ। আর আরো আসবে। কারণ মানুষের ফিতরাত জেগে উঠলে থামে না।
সন্ধ্যায় রহমান একা হাঁটছে।
সেই পুরনো রাস্তায়। সেই পুরনো দেয়ালের কাছে।
যেখানে একদিন লেখা ছিল - তুমি যদি সত্য চাও, তবে সাহস রেখো।
যেটা পরে মুছে গিয়েছিল। যেটায় সে লিখেছিল - সত্য মুছে যায় না। শুধু সময় নেয়।
সে দাঁড়ায়।
দেয়ালের দিকে তাকায়।
এবার সেখানে নতুন কিছু লেখা। অনেক হাতে। অনেক রঙে।
আল্লাহু আকবার। আমি ফিরে এসেছি। আমার দাদির কথা সত্য ছিল। আমিও খুঁজছি। ধন্যবাদ রহমান।
সে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।
এত কথা। এত মানুষের কথা। এই দেয়ালে।
সে হাত ছোঁয়ায়। একে একে।
তার চোখে জল।
কিন্তু এই জল আগের মতো নয়। এই জল কষ্টের নয়। এই জল কৃতজ্ঞতার।
সে মাথা তোলে। আকাশের দিকে।
কৃত্রিম আকাশ। কিন্তু তার ওপরে - আসল আকাশ আছে। সেটা কেউ কৃত্রিম করতে পারেনি।
সে বলে, আল্লাহ, তুমি আমাকে দিয়ে যা করালে - সেটা আমার নয়। এটা তোমার। আমি শুধু পথ ছিলাম।
এখন আমার একটাই চাওয়া - আমার বাবাকে একবার দেখতে চাই। তোমার অনুমতিতে। তোমার সময়ে। আমি অপেক্ষা করতে পারব।
বাতাস আসে।
শহরের শব্দের মাঝে একটা নরম কণ্ঠ ভেসে আসে।
দূর থেকে। অনেক দূর থেকে।
কিন্তু স্পষ্ট।
সময় হয়েছে।
রহমান থমকে যায়।
চারদিকে তাকায়।
কেউ নেই।
কিন্তু সেই কণ্ঠ।
স্বপ্নে শুনেছে। মায়ের বলা গল্পে শুনেছে।
সে দাঁড়িয়ে থাকে। নিঃশ্বাস বন্ধ।
তারপর শহরের একটা রাস্তার মোড়ে একটা মানুষ আসে।
বৃদ্ধ। ক্লান্ত। ভাঙা শরীর। কিন্তু সোজা মাথা।
চোখে সেই আলো। যেটা রহমান আয়নায় নিজের চোখে দেখেছে। শাইখের চোখে দেখেছে।
মানুষটা থামে।
রহমানের দিকে তাকায়।
কেউ কথা বলে না।
তারপর মানুষটা বলে, রহমান।
একটাই শব্দ।
কিন্তু সেই শব্দে পঁচিশ বছরের দূরত্ব ভেঙে পড়ে।
রহমান এগিয়ে যায়। একপা। দুপা।
তারপর ছুটে যায়।
আব্বু।
মানুষটা দুই হাত বাড়িয়ে দেয়।
দুজন দাঁড়িয়ে। শহরের মাঝখানে। কৃত্রিম আলোর নিচে।
কিন্তু তাদের চারপাশে সেই মুহূর্তে একটা সত্যিকারের আলো।
যেটা কোনো সিস্টেম তৈরি করেনি। যেটা কোনো প্রযুক্তি বোঝে না।
এটা আল্লাহর রহমতের আলো।
আর সেই আলোয় দুটো মানুষ - বাবা আর ছেলে - পঁচিশ বছর পরে একে অপরকে ধরে।
শহর চলছে। ডিজিটাল শোরগোল। কৃত্রিম আলো।
কিন্তু এই দুটো মানুষের কাছে এই মুহূর্তে - পুরো পৃথিবী থেমে গেছে।

পর্ব ১১

তারা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে। চোখে অশ্রু ঝরছে। কেউ কথা বলে না। পিনপতন নীরবতা।
শহরের শব্দ, আলো, ড্রোন - সব যেন দূরে সরে গেছে।
শুধু এই দুটো মানুষ। এই মুহূর্ত।
তারপর ফারুক আলী ছেলেকে ছেড়ে একটু পিছিয়ে আসেন।
ছেলের মুখের দিকে তাকান।
তুই বড় হয়ে গেছিস।
আব্বু, তুমি কোথায় ছিলে?
অনেক জায়গায়। অনেক ঘরে। একা। কিন্তু কখনো একা ছিলাম না।
মানে?
আল্লাহ ছিলেন। সবসময়। প্রতিটা রাতে। প্রতিটা ভোরে।
রহমান তাকিয়ে থাকে।
বাবার চেহারায় বয়সের ছাপ। চুল সাদা। গাল ভাঙা। হাত কাঁপছে।
কিন্তু চোখ। সেই চোখ একই। পঁচিশ বছরেও বদলায়নি।
সেই আলো। সেই দৃঢ়তা।
রহমান বলে, আমি তোমাকে খুঁজেছিলাম।
জানি।
তুমি কি জানতে আমি কোথায় আছি?
ফারুক আলী একটু হাসেন। জানতাম। কারণ তোমার কথা শুনতে পেতাম।
কীভাবে?
যে মানুষগুলো আমার কাছে আসত - তারা তোমার কথা বলত। ওই ছেলেটা কী বলেছে। কী প্রশ্ন করেছে। কাকে জাগিয়েছে।
আমি শুনতাম। আর মনে মনে বলতাম - আমার ছেলে।
রহমানের বুকে কষ্ট আর আনন্দ একসাথে।
তারা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে?
ফারুক আলী একটু থামেন।
দিয়েছে। অনেক। কিন্তু জানো - যখন কষ্ট দিচ্ছিল তখন আমি আল্লাহকে বলতাম - তুমি তোমার নবীদের কষ্ট দিয়েছিলে। আমি কী এমন মানুষ যে কষ্ট পাব না?
এই কথাটা মনে করলেই কষ্ট সহ্য হয়ে যেত।
রহমান চোখ মুছে।
আব্বু, তুমি কি ক্লান্ত?
হ্যাঁ। অনেক। কিন্তু তোমাকে দেখলাম। এখন মনে হচ্ছে বিশ্রাম নিতে পারব।
রহমান বাবাকে নিয়ে যায় মায়ের কাছে।
মায়ের দরজায় পৌঁছায়। কড়া নাড়ে।
মা দরজা খোলেন।
প্রথমে রহমানকে দেখেন। তারপর পাশে তাকান।
মুহূর্তের জন্য থমকে যান।
তারপর তার হাত দরজার চৌকাঠ ধরে। নইলে পড়ে যেতেন।
ফারুক?
ফারুক আলী এগিয়ে আসেন।
হ্যাঁ। আমি।
মা কাঁদেন। এবার শব্দ করে। পঁচিশ বছরের কান্না। এতদিন যা চেপে রেখেছিলেন।
ফারুক আলী তার হাত ধরেন।
ঘরে তিনজন। বাবা, মা, ছেলে।
যে পরিবার একদিন ভেঙে গিয়েছিল। আজ আবার।
রহমান একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখে।
তার বুকে কোনো শব্দ নেই। শুধু একটা অনুভব।
আল্লাহ ফেরান। সময় হলে। তার নিজের পথে। তার নিজের সময়ে।
রাতে তিনজন বসে।
ফারুক আলী বলেন।
আমাকে যখন নিয়ে গেল - প্রথম কয়েক বছর ছিলাম একটা ছোট ঘরে। একা। কোনো বই নেই। কোনো মানুষ নেই।
কিন্তু কুরআন ছিল। মনে। যা মুখস্থ ছিল।
রাতের পর রাত শুধু মনে মনে তেলাওয়াত করতাম। একা ঘরে। অন্ধকারে।
আর আল্লাহ সেই অন্ধকারে আলো দিতেন।
রহমান শোনে।
তারপর?
তারপর কয়েক বছর পরে আমাকে একটু স্বাধীনতা দিল। শহরের বাইরে একটা জায়গায়। সেখানে কিছু পুরনো মানুষ ছিল। তারাও আমার মতো।
আমরা একসাথে ছিলাম। একে অপরকে শেখাতাম। গোপনে। ছোট্ট একটা দল।
তারা কোথায় এখন?
ফারুক আলী একটু চুপ করেন।
কেউ কেউ আর নেই। বয়স হয়েছিল। কেউ কেউ আছে। ছড়িয়ে আছে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে।
তারা কি জানে তুমি এখানে?
জানে। আমি তাদের বলে এসেছি। তারাও আসবে। সময়মতো।
রহমান মাথা নাড়ে।
আব্বু, তুমি কি জানো - এই শহরে কী হয়েছে?
কিছুটা জানি। তোমার কথা শুনেছি। মসজিদের কথা শুনেছি। আযানের কথা শুনেছি।
পুত্র, তুমি যা করেছ - আমি পারিনি। তুমি পেরেছ।
তুমি পথ তৈরি করেছিলে আব্বু। আমি শুধু হেঁটেছি।
ফারুক আলী ছেলের দিকে তাকান।
না। তুমি নিজেও পথ তৈরি করেছ। এই দুটো জিনিস আলাদা নয়। প্রতিটা প্রজন্ম পথ তৈরি করে। পরের প্রজন্মের জন্য।
পরদিন।
রহমান বাবাকে নিয়ে যায় শাইখের কাছে।
শাইখ দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। যেন অপেক্ষায় ছিলেন।
দুজন দুজনকে দেখেন।
শাইখের চোখ ভিজে আসে।
ফারুক।
খালিদ ভাই।
দুজন বুকে বুক মেলান।
রহমান দেখে - দুজন বৃদ্ধ মানুষ। দুজনকেই এই শহর ভাঙতে চেয়েছিল। দুজনই ভাঙেনি।
শাইখ বলেন, তুমি ফিরে এসেছ। আল্লাহর শোকর।
তোমার কথা শুনতাম। তুমিও থামোনি।
তোমার ছেলেকে দেখেছ। সে কী করেছে।
ফারুক আলী হাসেন। দেখেছি। সে তার মায়ের চোখ পেয়েছে। আর তার বাবার হৃদয়।
শাইখ বলেন, এখন কী করবে?
ফারুক আলী একটু ভাবেন।
এখন? এখন কাজ করব। এখনো অনেক কাজ বাকি। শরীর ক্লান্ত। কিন্তু মন তৈরি।
তুমি বিশ্রাম নাও আগে।
বিশ্রাম পরে হবে। আগে কাজ।
শাইখ হাসেন।
তোমার ছেলেও এই কথা বলে।
সেই সন্ধ্যায়।
রহমান আর ফারুক আলী শহরের রাস্তায় হাঁটছেন। পাশাপাশি।
বাবা বলেন, তোকে একটা কথা বলি।
বলো।
এই শহর বদলাচ্ছে। কিন্তু এটা সহজ হবে না। আরো ঝড় আসবে। আরো চাপ আসবে। আরো প্রতারণা আসবে।
তুই কি প্রস্তুত?
রহমান একটু থামে।
আব্বু, আমি প্রতিদিন ভোরে উঠি। নামাজ পড়ি। আল্লাহকে বলি - আজকের দিনটা তোমার। আমাকে পথ দেখাও।
এটুকুই আমার প্রস্তুতি।
ফারুক আলী ছেলের দিকে তাকান।
এটুকুই যথেষ্ট।
তারা হাঁটতে থাকেন।
রাস্তায় মানুষ। কেউ চেনে। কেউ ডাক দেয়। রহমান ভাই!
রহমান হাত নাড়ে।
বাবা দেখেন।
তারা তোকে চেনে।
কিছুটা।
না। অনেক। তাদের চোখে দেখলাম। তারা তোকে বিশ্বাস করে।
রহমান বলে, আমি ভয় পাই। এত মানুষ বিশ্বাস করে, যদি আমি ভুল করি?
সেই ভয়টাই তোকে ঠিক রাখবে। যে ভয় পায় না সে ভুল করে। তুই ভয় পাচ্ছিস মানে তুই সৎ।
কয়েক সপ্তাহ পরে।
সেই পুরনো মসজিদ। যেটা মিউজিয়াম ছিল। যেটা একদিন জুমার পরে বন্ধ করা হয়েছিল।
সেটা আবার খোলে।
এবার অন্যভাবে।
শহরের কিছু মানুষ যারা নেভির সিস্টেমের বাইরে ছিলেন তারা আইনি পথে লড়াই করেছিলেন।
দীর্ঘ লড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা রায় আসে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি মৌলিক মানবিক অধিকার। এটি রাষ্ট্র কেড়ে নিতে পারে না।
মসজিদের দরজা খোলে।
প্রথম দিন সেই মসজিদে ফারুক আলী ইমামতি করেন।
রহমান পেছনে। মান্নান পাশে। কোয়েল পেছনে। ইউসুফ পেছনে। ডক্টর লিরা পেছনে। জিনো পেছনে। অ্যাভা পেছনে। আরো অনেকে।
নামাজ শুরু হয়।
ফারুক আলীর কণ্ঠে তেলাওয়াত। সেই কণ্ঠ। যে কণ্ঠ পঁচিশ বছর বন্দী ছিল। আজ মুক্ত।
সূরা ফাতিহা।
আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।
মসজিদে কান্নার শব্দ।
রহমান সিজদায় যায়। কপাল মেঝেতে।
এই মেঝে। এই মসজিদ। এই মুহূর্ত।
সে ফিসফিস করে বলে, আল্লাহ, তুমি লিখেছিলে। আমাকে দিয়ে। আমার বাবাকে দিয়ে। এই মানুষগুলোকে দিয়ে।
তোমার শোকর। তোমার শোকর। তোমার শোকর।
মাস যায়। বছর যায়।
শহর ধীরে ধীরে বদলায়।
এটা হঠাৎ হয় না। একদিনে হয় না।
কিন্তু হয়।
একটা স্কুলে একজন শিক্ষক প্রথমবার ছাত্রদের বলেন, পৃথিবীর উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ আছে। বিজ্ঞান একটা মতবাদ দেয়। ধর্ম আরেকটা। তোমরা ভাবো। নিজেরা প্রশ্ন করো।
একটা ক্যাফেতে কোনো এক সন্ধ্যায় দুজন তরুণ কুরআন নিয়ে কথা বলছে। লুকিয়ে নয়। প্রকাশ্যে।
একটা পার্কে একটা মা তার ছোট্ট মেয়েকে পড়াচ্ছেন। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
ছোট্ট মেয়ে শুনছে। বড় বড় চোখে।
একটা হাসপাতালে এক বৃদ্ধ মারা যাওয়ার আগে প্রথমবার কালিমা পড়েন।
নার্স শুনে অবাক হন। কিন্তু থামান না।
এগুলো ছোট। এগুলো ধীর।
কিন্তু এগুলোই আসল পরিবর্তন।
কারণ বড় পরিবর্তন সবসময় ছোট ছোট মুহূর্ত থেকে শুরু হয়।
একদিন রহমানের কাছে একটা বার্তা আসে।
আমি কি তোমার সাথে কথা বলতে পারি? আমার নাম নেভি।
রহমান একটু ভাবে। তারপর উত্তর দেয়। আসো।
নেভি আসেন।
আগের মতো চকচকে নন।
বসেন।
আমি তোমার বিরুদ্ধে অনেক কিছু করেছি।
জানি।
তুমি রাগ করোনি?
করেছিলাম। কিন্তু রাগ ধরে রাখা আমার কাজ নয়।
নেভি চুপ করে থাকেন।
আমার মা মারা যাওয়ার আগে একটা কথা বলেছিলেন। বাবা, কোনো প্রশ্নের উত্তর না পেলে চুপ করে থেকো। উত্তর আসবে।
আমি সারাজীবন সেই কথা ভুলে ছিলাম। কয়েক মাস আগে হঠাৎ মনে পড়ল।
রহমান শোনে।
আমি প্রকল্প নীরবতা বাতিল করেছিলাম। কেন করেছিলাম জানতাম না। এখন মনে হচ্ছে - মায়ের কথা মনে পড়েছিল বলেই।
তোমার মা বিশ্বাসী ছিলেন?
হ্যাঁ। খুব। আমি সেটা দেখেছিলাম। কিন্তু মানিনি। নিজেকে স্মার্ট ভেবেছিলাম।
রহমান বলে, তোমার মায়ের বিশ্বাস তোমার মধ্যে মরেনি। ঘুমিয়েছিল। এখন জেগে উঠছে।
নেভি একটু কাঁপেন।
আমি কোথা থেকে শুরু করব?
রহমান বলে, তোমার মায়ের কথা থেকে। তিনি যা বলেছিলেন। সেখান থেকে।
দুই হাজার পঁয়ত্রিশ।
শহরে প্রথমবার পাঁচটি মসজিদ থেকে একসাথে আযান।
পাঁচটি কণ্ঠ। পাঁচটি দিক থেকে।
আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার। আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
শহর জেগে ওঠে।
কেউ কেউ জানালা খোলে। কেউ কেউ বাইরে আসে। কেউ কেউ কাঁদে।
রহমান ছাদে দাঁড়িয়ে। বাবা পাশে।
দুজন শুনছেন।
ফারুক আলীর চোখ বন্ধ। ঠোঁটে অস্পষ্ট কিছু।
রহমান শোনে।
আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম। নামাজ ঘুমের চেয়ে উত্তম।
সেই বাক্য।
শহরের কৃত্রিম আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে।
রহমান মনে করে সেই রাতের কথা। নববর্ষের রাত। সে একা এসেছিল এই মসজিদের পাশে। মাটিতে বসেছিল। ফিসফিস করে বলেছিল - তুমি শুধু মোরে লিখে নিয়ো।
আল্লাহ লিখেছেন।
এই শহরে। এই মানুষগুলোতে। এই আযানে।
সে চোখ বন্ধ করে।
আল্লাহু আকবার।
ঠোঁটে সেই শব্দ। বুকে সেই অনুভব।
আকাশ জুড়ে সেই ডাক।
সেই রাতে।
ঘরে বাবা আর ছেলে।
ফারুক আলী বলেন, রহমান, তোকে একটা কথা বলি।
বলো আব্বু।
আমি যখন বন্দী ছিলাম তখন একটাই চাওয়া ছিল। তোকে একবার দেখব। তোর মুখে শুনব - সে ঠিক আছে। সে হারায়নি।
রহমান চুপ করে শোনে।
আজ দেখলাম। আর দেখলাম শুধু তুই হারিয়ে যাসনি বরং - তুই অনেককে ফিরিয়ে এনেছিস।
আমি যা করতে চেয়েছিলাম তুই সেটা করেছিস। আমার চেয়ে ভালোভাবে।
আব্বু -
চুপ কর। বাবার কথা শোন।
পুত্র, এই লড়াই শেষ হয়নি। এটা কোনোদিন শেষ হবে না। যতদিন পৃথিবী আছে। কিন্তু তুই আজকে যা করেছিস - এটা আগামী প্রজন্মের জন্য। তোর পরের প্রজন্ম হয়তো আরো ভালো করবে। তোর পরেরটা আরো ভালো।
ইসলাম এভাবেই চলে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। বাবা থেকে ছেলেতে। শাইখ থেকে ছাত্রতে।
রহমান বলে, আব্বু, আমি ভয় পাই। যদি একদিন আবার সব ভেঙে পড়ে।
ফারুক আলী ছেলের দিকে তাকান।
ভাঙবে। একদিন না একদিন। এই পৃথিবীতে কিছুই চিরকাল টেকে না।
কিন্তু জানিস কী টেকে?
সত্য।
সত্য বারবার ভেঙে পড়ে। বারবার উঠে দাঁড়ায়। কারণ সত্যের পেছনে আল্লাহ আছেন। আর আল্লাহকে কেউ ভাঙতে পারে না।
রহমান মাথা নত করে।
আমাকে দোয়া করো আব্বু।
ফারুক আলী হাত তোলেন।
আল্লাহ, আমার ছেলেকে হেফাজত করো। তাকে সত্যের পথে রেখো। তার মাধ্যমে এই পৃথিবীতে আলো ছড়াও। তুমি যাকে চাও তাকে দিয়ে কাজ করাও। তুমি সর্বশক্তিমান।
ঘরে নীরবতা।
তারপর দুজন একসাথে বলে, আমিন।
পরদিন সকালে।
রহমান ঘুম থেকে ওঠে।
বাবা আগে উঠেছেন। ফজর পড়ছেন।
রহমান বসে দেখে।
তারপর উঠে পাশে দাঁড়ায়। বাবার পাশে।
দুজন একসাথে নামাজ পড়ে।
নামাজ শেষে বাবা বলেন, তোকে একটা জিনিস দেব।
পুরনো একটা ভাঁজ করা কাগজ। অনেক পুরনো। কিনারগুলো শেষ হয়ে আসছে।
রহমান খোলে।
একটা পত্রিকার কাটিং।
তারিখ লেখা - সাত জুলাই দুই হাজার পঁচিশ।
রহমান থমকে যায়।
এটা -
হ্যাঁ। আমি এটা পেয়েছিলাম।
রহমান পত্রিকাটি ধরে আছে। হাত কাঁপছে।
এই তারিখ। এই সেই তারিখ। স্বপ্নে বারবার দেখেছে। বিলবোর্ডে দেখেছে। সবসময় ফিরে এসেছে। ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লোক।
রহমান বাবাকে বলে সেই স্বপ্নের কথা। আমি স্বপ্নে এই পত্রিকা দেখেছি। দেখেছি আমি মুকুট ভেঙে তার উপর দাঁড়িয়ে। আরও দেখেছি ঝাঁকড়া চুলওয়ালা একটি মানুষকে, যার চোখে ছিল স্বপ্ন, ভয়, ব্যাকুলতা, আগুনের ঝলকানি আর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তিনি আমাকে বারবার ডাকছিলেন। বাবা বলুন, আপনি পত্রিকার সম্পর্কে জানেন তাহলে নিশ্চয়ই ঝাঁকড়া চুল ওয়ালা ব্যক্তিটির সম্পর্কে জানবেন। বলুন আমাকে, তিনি কে। এই স্বপ্নের রহস্য কি।
নিশ্চয়ই বলবো। এখনই সময়, পুত্র। আমি কৃতজ্ঞ সেই মহান রবের কাছে যিনি তোমাকে দুই শত বছর আগের সেই সত্যটা বাস্তবের ন্যায় স্বপ্নে তুলে ধরেছেন।
ফারুক আলী দুই হাজার পঁয়ত্রিশ সালে বসে দুই হাজার পঁচিশ সালের ইসলামের অসময়ের ইতিহাস আব্দুর রহমানের সামনে তুলে ধরতে শুরু করলেন।

পর্ব ১২

"এখনই সময়, পুত্র। আমি কৃতজ্ঞ সেই মহান রবের কাছে যিনি তোমাকে দুই শত বছর আগের সেই সত্যটা বাস্তবের ন্যায় স্বপ্নে তুলে ধরেছেন।"
ফারুক আলী ২২৩৫ সালে বসে ২০২৫ সালের ইসলামের অসময়ের ইতিহাস আব্দুর রহমানের সামনে তুলে ধরতে শুরু করলেন।
একটি রোবটিক ড্রোন উড়ে এসে তাদের সামনে পড়ল আর বলতে লাগলো "কিছু লাগলে অর্ডার করতে পারেন" । আব্দুর রহমান সেটাকে ভেঙ্গে ফেললেন।
ফারুক আলী বলতে লাগলেন।
১৮৫৭ সাল।
যখন মুসলিমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পায়ের নিচে, তখন শুরু হয়ে গেল বিদ্রোহ। বাঁচার লড়াই। মুসলিম এবং হিন্দুরা যৌথভাবে প্রচেষ্টা চালালো। সিপাহীরা দলবদ্ধভাবে বিদ্রোহ চালায়, যা মুহূর্তের মধ্যে উত্তর ও মধ্য ভারতের একটি বিশাল গণ আন্দোলনের রূপ নেয়। অতঃপর বিদ্রোহীরা দিল্লি দখল করে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের সম্রাট ঘোষণা করেন।
বিদ্রোহটি দমন করতে পারলেও ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে আর ভারত শাসন করা সম্ভব নয়। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে Government of India Act 1858 পাসের মাধ্যমে কোম্পানির শাসনের চিরতরে অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি রানী ভিক্টোরিয়ার হাতে চলে যায়।
তখন ব্রিটিশরা বুঝতে পারেন, মুসলিমদের আছে ঈমানী শক্তি। তারা যতদিন একত্রিত থাকবে ততদিন তাদেরকে প্রতিহত করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা তাদেরকে কোণঠাসা করতে পারবো না। তারা যে বই পড়ে দিন শুরু করে, সেই বই জিহাদের ঘোষণা দেয়।
তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই আমরা সহজেই হিন্দুত্ববাদ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবো। তখন ব্রিটিশদের মূল শত্রু হয়ে যায় মুসলিমরা।
তারা তখন শুরু করলো ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক কৌশল "Divide and Rule - ভাগ করো তারপর শাসন করো"। মুসলিমদের ভিতরে ফাটল ধরাতে শুরু করল।
তারা ভাবলো, মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে দিলে তারা নিজেদেরকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে, তখন আমাদের পথ হবে মসৃণ।
আর সেটাই হলো। শিয়া এবং সুন্নিদের পথ তারাই সহযোগিতা করে সহজ করে দিল। আহলে হাদিসদের মদদ দেওয়া শুরু করল। আহলে হাদিস এর যারা অনুসারী হবে তারা হাদিসকে কেন্দ্র করে জীবন নিয়ন্ত্রণ করবে। এতে তারা কোরআন থেকে দূরে থাকবে।
তারা বিশ্বাস অর্জনের জন্য মাদ্রাসা তৈরি করল। সেই মাদ্রাসাগুলোতে বিভিন্ন মত প্রতিষ্ঠা হতে শুরু হলো। মুসলিমরা ভেঙে যেতে লাগলো। আহলে হাদিস ও সুন্নিরা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল। শুধু এতটুকুই নয়।
এর কিছুদিন পরেই মির্জা গোলাম আহমেদ নিজেকে ইমাম মাহদী দাবী করা শুরু করল। শুরু হলো আরেকটি অধ্যায়। তার অনুসারী বৃদ্ধি পেল। একটা কমিউনিটি তৈরি হল। নাম: আহমেদিয়া বা কাদিয়ানী। মির্জা গোলাম আহমদ কখনো কখনো নিজেকে শেষ রাসূল দাবি করতেন আবার কখনো ইমাম মাহদী আবার কখনো ঈসা আলাইহিস সালাম।
এভাবে ফাটল শুরু হয়ে গেল। যুগের পর যুগ কেটে যাচ্ছে, কেউ প্রশ্ন তুলছে না শুধুমাত্র নিজেদের মত প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে একধাপ এগিয়ে ছুটছেন। কুসংস্কার ঢুকে পড়ছে, মুসলিমরা নিজেদের অত্মসন্মানবোধ হারিয়ে ফেলছেন, নিজেকে সঠিক বলছেন, আবার ভিন্ন মতাদর্শের লোকদের কাফির, অমুসলিম বলছেন। সময়ের পরিক্রমায় প্রতিটি মত প্রতিষ্ঠিত হলো। সবাই নিজেদের সঠিক আর বাকিদের পথভ্রষ্ট বলে দাবি করতে লাগলো।
এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো - মানুষজন হাদীস গ্রন্থকে কুরআনের নেয় বিশ্বাস করতে লাগলো। আলেমগণ নিজেরাই বিভিন্ন মত প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। সেই সাথে হাদীস পূজারী আলেমগণ বলতে লাগলেন, কোরআন আর হাদিস হলো একটি পাখির দুটি ডানা। যেখানে আল্লাহ পাক বলেছেন কুরআনই একমাত্র ওহী যা শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর নাযিল করা হয়েছে, কুরআন থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে, কুরআনকে একমাত্র জীবন বিধান বলা হয়েছে। সেই কোরআনকে যে হাদিসের সাথে তুলনা করা হচ্ছে সেই হাদিস লেখার অনুমোদন তো ছিলই না বরং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুড়িয়ে ফেলতে বলেছেন। আর সেগুলো রাসুলুল্লাহর ইন্তেকালের শতাধিক বছর পর লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
এভাবেই তারা ডুবে যেতে শুরু করলো।
আর একটা পর্যায়ে ব্রিটিশদের চেয়ে বেশি উপকৃত হতে লাগলো নাস্তিকরা।
সেই ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মানুষ।
২০২৩ সাল। রমজান মাস শুরু হয়েছে কেবল। ইউটিউবে হঠাৎ একটি লাইভ তার সামনে আসে। সেখানে কিছু নাস্তিক ছিলেন যারা সুবিধা নিচ্ছিলেন হাদিস থেকে। তারা সেই সমস্ত অযৌক্তিক হাদিস তুলে ধরতেন, যেগুলো সহীহ ট্যাগ লাগানো অথচ কুরআনের সাথে সামঞ্জস্য নয়। তবুও সহীহ। কারণ আলেমদের তর্কে জেতার জন্য নিজেদের পক্ষে যে হাদীসটি থাকবে, সেটা তো অবশ্যই সহীহ । হোক না সেটা কুরআনের সাথে অসামঞ্জস্য।
আর এই সমস্ত হাদিসগুলোকে আলেমদের ভিডিও ক্লিপ রেফারেন্সের মাধ্যমে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে লাগলো নাস্তিকরা।
তিনি লাইভে লক্ষ করলেন। মানুষ দেখছে কিন্তু ২০,২৫ জন।
সময়টা গড়াতে লাগলো। রমজানের শেষের দিকে। তিনি আবারও একটি লাইভ দেখতে পেলেন। তবে তখনও মানুষ দেখছে কিন্তু ২০k-২৫k। তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি স্থানীয়দের সাথে কথা বললেন। কেউ কেউ প্রতিক্রিয়া দেখালো কিন্তু, নাস্তিকতার হার ঠেকানো যাচ্ছিল না কোনোভাবেই। ৯৫% মুসলিমের দেশ বাংলাদেশ। সেখান থেকেই মুসলিমদেরকে পথভ্রষ্ট করা হচ্ছে অথচ রাষ্ট্র পরে আছে ক্ষমতার লড়াইয়ে। ক্ষমতার লোভে নেতারা অন্ধ । টেকনোলজি উন্নত হচ্ছে আর সাধারণ মানুষ বন্দি হচ্ছে ডিভাইসে। এআই এর সূচনা সেখান থেকেই। মানুষ তার উদ্দেশ্য ভুলে যাচ্ছে, মুসলিমরা সংশয়বাদী হচ্ছে। মাহফিলগুলো ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে। কিছুদিন হাদিস পড়ে আলেমের লেবাস পরে একেকটা মাহফিল থেকে হাজার হাজার টাকা কামাচ্ছে ইসলামিক স্কলার নামক ধর্ম ব্যবসায়ীরা।
এমন একটি সময়ে, সত্য বলতে গেলে প্রাণ নাশের উপক্রম হয়। সেখানেই প্রতিবাদের মশাল হাতে দাঁড়িয়েছিল সেই ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লোকটি। সে চেয়েছিল ইসলামের বিপর্যয় ঠেকাবে। কিন্তু তাকে থামানো হয়েছিল। সেই সমাজ সেই মানুষ সেই অন্ধ মানুষগুলো সেই পরিস্থিতি তার হাত পা বেঁধে ফেলেছিল। সে থেমে যাওয়ার নামে সেদিন মরে গিয়েছিল, যদিও দেহে প্রাণ ছিল।
তিনি সেদিন একটা পত্রিকা দেখলেন। যেখানে দেখলেন, প্রথম শিরোনাম: ৬ বছর বয়সী মেয়েকে ৪ জন মিলে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে।
দ্বিতীয়: নেতার কুকর্ম দেখে ফেলার কারণে এক বৃদ্ধের চোখ উপড়ে ফেলা হয়।
তৃতীয়ত: একদল নামাজিদের হত্যা করলে পংক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে জান্নাত যাওয়া যাবে - (বিখ্যাত হাদিস পূজারী)।
চতুর্থত: এদেশে শরিয়া আইন বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে প্রাণ দিতে হবে - (বড় হাতওয়ালা নেতা)।
সংবাদ ঠিকই আসে কিন্তু বিচারে রাজনীতি।
এগুলো দেখে তিনি কেঁদে ফেলেন। চিৎকার দিয়ে বলতে থাকেন -
"তোমাদের সোনার সিংহাসন উপড়ে ফেলা হবে।
তোমাদের অন্যায়ের মুকুট আমাদের পায়ে পিষ্ট হবে।
সময় আসবে একদিন। সেদিন এই গোটা সিস্টেম চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে।
আল্লাহর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
প্রিয় নবীজির রক্তে গড়া ঐক্য আবার গড়ে উঠবে।
ইয়া রাব্বি! ইয়া রাব্বি! অসহায়দের বাঁচাও। ক্ষমতা লোভীদের দেহ পিঞ্জর ছিঁড়ে ফেলো। তোমার সত্য তুমি ফেরাও।"
আল্লাহ তোমার স্বপ্নে তোমাকে সেই ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লোকটির সেই সময়কে দেখিয়েছেন। পুত্র, তুমি তার ভাঙতে চাওয়া মুকুট ভাঙার যোগ্য।
আব্দুর রহমান নির্বাক। শুধু শুনে যাচ্ছেন বাবা ফারুক আলীর কাছ থেকে। সে জিজ্ঞেস করে বসলো। "বাবা, আপনি এসব জানলেন কিভাবে?"
"কিছুক্ষণ পরই জানতে পারবে।" ফারুক আলী এই বলে আবার পরবর্তী ঘটনা বলতে লাগলেন।
২০৫০ সাল।
টেকনোলজি আরও অনেক উন্নত হতে শুরু করলো। মানুষ ভুলে যাচ্ছিল পূর্বপুরুষদের রীতিনীতি। ডুবে যাচ্ছিল টেকনোলজির ভেতর আর মাদকাসক্তে যুক্ত হতে লাগলো তরুণ সমাজ। এ যেন আইয়ামে জাহিলিয়াত এসে পড়ল। নাস্তিকতার হার বেড়েই চলেছে, থামাবার লোক কেউ নেই। সবাই নিজ মত প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। এভাবে ধীরে ধীরে ইসলাম যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে লাগলো। সত্য হারিয়ে গেল মিথ্যার আড়ালে, নেয় ডুবে গেল অন্যায়ের সাগরে, অন্যায় অনিয়ম শুরু হল, বৃদ্ধাশ্রম বেড়ে গেল, অবাধ যৌনাচার আর সমকামিতার অনুপ্রেরণা একাডেমিক বই থেকে দেওয়া শুরু হলো।
তখনো কিছু মানুষ আওয়াজ তুলত কিন্তু সে আওয়াজ কারো কানে পৌঁছালো না। ওই লোকগুলো এতটাই মোহে অন্ধ হয়ে গেল যে চোখ থাকতেও আর দেখতে পাচ্ছে না কান থাকতেও শুনতে পাচ্ছে না অন্তর থাকতেও ভাবতে পারছে না। চাঁদাবাজি, খুন, গুম, যিনা-ব্যভিচার, অন্যায় অবিচার সবকিছু তাদের উপর চেপে বসলো। অন্ধকারের পথে আগে পৌঁছতে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেলো।
২১০০ সাল।
নাস্তিক্যবাদ এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ধর্ম ব্যবসা বন্ধ হয়েছে ঠিকই কিন্তু উন্নত টেকনোলজির যুগে ইসলাম অপ্রিয় বস্তুতে পরিণত হচ্ছে। শহরগুলোর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। রোবটিক সেবা চালু হয়েছে। গোটা পৃথিবী নিওন আলোয় ঢেকে পড়ছে ধীরে ধীরে। তখনো কিছু মুসলিম ন্যায় ফেরার অপেক্ষায়।
২১৫০ সাল।
নাস্তিকরা অবশেষে সফল। তারা মানুষের মন থেকে প্রশ্ন করে নিয়েছে।
হাই-টেক দিয়ে যেন মানুষদের কিনে ফেলেছে। মানুষ এতটাই সুবিধা পাচ্ছে যে তারা আর পিছনে ফিরে তাকানোর চেষ্টাও করছে না।
এমন সময় তারা আরেকটি খেলা খেলেছিল। তারা মসজিদগুলোকে মিউজিয়ামে পরিণত করতে শুরু করে। নতুন প্রজন্মকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে শুরু করে যে তারা যেন প্রথম পৃথিবীতে পড়ল তাদের পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব ছিল না। এভাবে তাদেরকে অতীত থেকে মুক্ত করে নতুন পৃথিবীর স্বাদ দিতে শুরু করল। তারাও বড় হওয়ার সাথে সাথে প্রশ্ন করতে ভুলে গেল। যারা সেই সময় ঈমান পুষে রেখেছিল তারা ভয়ে কিছু বলতে পারত না।
মনে রেখো পুত্র, যেদিন মানুষ - ধর্মের ব্যাপারে অনীহা, ক্ষমতার লোভে আত্মসম্মানবোধ হারানো, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া, লোভের বশবর্তী হয়ে আর মানুষের সামনে নিজেকে বড় করে দেখানোর জন্য, নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য নিজের আলাদা মত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিল, এই সব কিছুর সূচনা সেদিন হয়েছিল। আর ধীরে ধীরে তারা নিজেদের ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করেছিল অজান্তেই। আর মাঝখান থেকে ফায়দাটা লুফে নিয়েছিল নাস্তিকরা।
আব্দুর রহমান সবকিছু শুনলেন, শুনে পাগলের মতো করতে লাগলেন।
মুসলমান কিভাবে এতটা বিবেকহীন হতে পারে?
কিভাবে তারা ঐতিহ্য ভুলে গেলো?
এই লোভ কি শুধু শয়তানের প্ররোচনায়?
সে আবার জিজ্ঞেস করে বসলো। "বাবা, আপনি এসব জানলেন কিভাবে? কিভাবে জানলেন সেই ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লোকটির ঘটনা?"
ফারুক আলী চোখ দিয়ে পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন -
"ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লোকটিই হলো তোমার পূর্বপুরুষ, আমার পূর্বপুরুষ।"
"আপনি বলেন কি?"
"ঠিকই বলেছি পুত্র। ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লোকটির প্রচেষ্টার কথা আমাকে আমার বাবা বলেছে, বাবাকে তার বাবা বলেছে। আমরা ওই ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লোকটির বংশধর।"
আব্দুর রহমান কেঁদে ফেললেন। শান্ত হয়ে বসে আছেন কিন্তু চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরছে। নির্বাক হয়ে বসে আছেন মনে হচ্ছে ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।

পর্ব ১৩

ঠিকই বলেছি পুত্র। ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লোকটির প্রচেষ্টার কথা আমাকে আমার বাবা বলেছে, বাবাকে তার বাবা বলেছে। আমরা ওই ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লোকটির বংশধর। হ্যাঁ, ওনার রক্তই আমার শরীরে বইছে, তোমার শরীরেও।
আব্দুর রহমান কেঁদে ফেললেন। শান্ত হয়ে বসে আছেন কিন্তু চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরছে। নির্বাক হয়ে বসে আছে, ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। তবে এতোটুকু বুঝতে পেরেছে যে মহান সৃষ্টিকর্তাই তাকে একটু একটু করে জাগিয়ে তুলেছে, পৃথিবীতে আবার ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
রাত গভীর। বাইরে শহর জ্বলছে কৃত্রিম আলোয়। কিন্তু এই ছোট্ট ঘরে দুটো মোমবাতি জ্বলছে। পুরনো অভ্যাস, ফারুক আলীর। বন্দিজীবনে মোমবাতির আলোয় পড়তেন। সেই অভ্যাস যায়নি।
রহমান মেঝেতে বসে। বাবা সামনে। আব্বু, তুমি ২০২৫ সালের সেই মানুষটির কথা বললে। সেই ঝাঁকড়া চুলওয়ালা। যে প্রথম প্রতিবাদ করেছিল।
ফারুক আলী চোখ বন্ধ করেন। স্মৃতি থেকে কিছু একটা টেনে আনেন। হ্যাঁ। তার তার নির্দিষ্ট নাম বলা নিষেধ, সেই সময় যারা চোখ মেলে সত্যটা দেখেছিলেন তাদের সবাইকে যেন অনুভব করতে পারি এই জন্যে। সে একা দাঁড়িয়েছিল, একা। যখন নাস্তিকেরা হাসতে শুরু করেছিল। যখন হাদিসকেই ধর্মের মেরুদন্ড বানানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছিল। যখন কোরআনকে - হাদীস বিহীন অপরিপূর্ণ ভাবতে শুরু করেছিল। যখন অন্যায় অবিচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। যখন ধর্মকে বিকৃত করা হচ্ছিল মাহফিলের নামে। যখন ধর্মীয় শিক্ষা দান ব্যবসায় পরিণত হয়েছিল। সে একা দাঁড়িয়েছিল। একা বলেছিল - তোমরা ভুল করছ।
কেউ শোনেনি। কিন্তু সে থামেনি।
রহমান শোনে। তার বংশ আমাদের বংশ। তার শপথ আমাদের শপথ। তুই যখন স্বপ্নে তাকে দেখিস, সেটা আল্লাহই দেখায়। কারণ তুই তার উত্তরাধিকার। তুই সেই শপথের ধারক।
রহমান বলে, সেই শপথ কি পূরণ হয়েছে আব্বু?
ফারুক আলী চোখ খোলেন। না। এখনো না। মসজিদ খুলেছে। মানুষ ফিরছে। কিন্তু এটা শুরু। সত্যিকারের লড়াই এখনো বাকি।
পরদিন সকালে। রহমান, মান্নান, কোয়েল, জিংকা - সবাই একসাথে বসেছে। শাইখ খালিদও আছেন। ফারুক আলীও আছেন। টেবিলে একটা পুরনো কাগজ। শহরের মানচিত্র। হাতে আঁকা।
শাইখ বলেন, মসজিদ খুলেছে। মানুষ আসছে। কিন্তু শুধু মসজিদ যথেষ্ট নয়। এই শহরে শিশুরা কী শিখছে? স্কুলে কী পড়ানো হচ্ছে? পরিবারগুলো কেমন আছে? তরুণরা কোথায় যাচ্ছে? শুধু একটা জায়গা ঠিক করলে বাকি সব জায়গা ভুল থাকলে শেষ পর্যন্ত সেই একটা জায়গাও টিকবে না।
রহমান শোনে। তাহলে কী করতে হবে?
শাইখ বলেন, শিক্ষা। পরিবার। সমাজ। এই তিনটা ঠিক না হলে মসজিদ শুধু একটা ভবন।
মান্নান বলে, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা সিস্টেমের হাতে। তারা কি ছাড়বে? ছাড়বে না। সেটাই লড়াই।
কয়েক সপ্তাহ পরে। রহমান একটা স্কুলে যায়। শহরের পূর্ব প্রান্তে। পুরনো এলাকা। যেখানে গরিব মানুষ থাকে। সেই স্কুলে একজন শিক্ষক আছেন। নাম তারিক। তিনি গোপনে রহমানের কথা শুনেছেন। খুঁজে বের করেছেন। আমি শিশুদের পড়াই। সরকারি বই পড়াতে হয়। সেখানে লেখা - ধর্ম মানুষের তৈরি। বিজ্ঞান মানুষকে মুক্ত করেছে। আমি এটা পড়াতে পারি। কিন্তু বিশ্বাস করি না। কী করব?
রহমান - বই পড়াও। কিন্তু প্রশ্ন করতে শেখাও। এই কথাটা কি সত্যি? কেন সত্যি মনে হচ্ছে? অন্য কোনো মতবাদ আছে কি? শিশু যদি প্রশ্ন করতে শেখে - সিস্টেম তাকে প্রোগ্রাম করতে পারবে না।
তারিক বলেন, কিন্তু এটা করলে আমার চাকরি যেতে পারে। হ্যাঁ। হতে পারে। কিন্তু তুমি যদি না করো - এই শিশুগুলো বড় হবে প্রশ্নহীন মানুষ হয়ে। সেটা কি ভালো?
তারিক চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, না। ভালো না। তাহলে?
দীর্ঘ নিঃশ্বাস। ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করব।
তারিকের মতো আরো মানুষ আছেন। শহরের বিভিন্ন কোণে। গোপনে। একা একা। তারা ভয় পাচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বাস ছাড়েননি। রহমান তাদের খুঁজে বের করে। একে একে। বলে - তুমি একা নও। আমরা আছি। আর তারা একত্রিত হয়। ছোট ছোট দল। কিন্তু দৃঢ়।
একদিন। লুকাস মর্গ্যান - সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক যিনি মানুষের বিশ্বাস মুছে দেওয়ার প্রযুক্তি বানিয়েছিলেন - তিনি রহমানকে একটা প্রস্তাব পাঠান। আমি তোমার সাথে আবার কথা বলতে চাই। এবার একা। কোনো দর্শক নেই। শুধু আমি আর তুমি।
রহমান যায়। লুকাসের গবেষণাগার। চারদিকে যন্ত্রপাতি। স্ক্রিন। তথ্য। লুকাস বলেন, তুমি আমাকে আগে একটা প্রশ্নে আটকে দিয়েছিলে। নৈতিকতার ভিত্তি নিয়ে। আমি উত্তর দিতে পারিনি। মনে আছে। আমি তখন থেকে ভাবছি। আমি একটা উত্তর খুঁজে পেয়েছি। কী উত্তর?
লুকাস বলেন, বিবর্তন। আমরা সহযোগিতা করতে শিখেছি কারণ এতে টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। নৈতিকতা আসলে বিবর্তনীয় কৌশল।
রহমান একটু হাসে। এই উত্তর আমি আশা করেছিলাম। কিন্তু এটা উত্তর নয়। এটা আরেকটা প্রশ্ন তৈরি করে। কীভাবে?
বিবর্তন বলে টিকে থাকাটাই লক্ষ্য। কিন্তু কেন টিকে থাকব? আমি যদি সিদ্ধান্ত নিই টিকে না থেকে মরে যাব - সেটা কি ঠিক? বিবর্তন বলতে পারবে না এটা ভুল। কারণ বিবর্তনের কাছে ভুল বলে কোনো ধারণা নেই। শুধু টিকে থাকা আর না থাকা আছে। তাহলে আত্মহত্যা কি ভুল? শিশু হত্যা কি ভুল? বিবর্তনের ভিত্তিতে উত্তর দিন।
লুকাস থামেন। এটা জটিল প্রশ্ন। জটিল নয়। সরল। কিন্তু উত্তরটা আপনার তত্ত্বের বাইরে। আমি বলি কেন আত্মহত্যা ভুল। কেন শিশু হত্যা ভুল। কারণ মানুষের একটা মূল্য আছে। সেই মূল্য কে দিয়েছে? বিবর্তন দেয়নি। কারণ বিবর্তন শুধু কার্যকারিতা দেখে। সমাজ দেয়নি। কারণ সমাজ পরিবর্তনশীল। আজ যা ঠিক কাল ভুল। সেই মূল্য দিয়েছেন তিনি যিনি মানুষকে তৈরি করেছেন। যিনি বলেছেন - আমরা আদম সন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি। এই মর্যাদা বাইরে থেকে আসে না। ভেতর থেকে আসে। সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে আসে।
লুকাস দীর্ঘক্ষণ চুপ। তারপর বলেন, কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব - প্রমাণ হয় না। আমি জানি। কিন্তু অস্বীকারও হয় না। আর যদি না হয় - তাহলে দুটো পথ। এক - ঈশ্বর আছেন। তাহলে নৈতিকতার ভিত্তি আছে। মানুষের মূল্য আছে। জীবনের অর্থ আছে। দুই - ঈশ্বর নেই। তাহলে নৈতিকতার কোনো ভিত্তি নেই। মানুষের কোনো মূল্য নেই। জীবনের কোনো অর্থ নেই। আপনি কোনটা বেছে নেবেন?
লুকাস উঠে দাঁড়ান। জানালার কাছে যান। বাইরে শহর। তুমি চলে যাও। আমার ভাবতে হবে।
রহমান উঠে দাঁড়ায়। ভাবুন। কিন্তু ভাবতে ভাবতে একটা কথা মনে রাখবেন। আপনি যে প্রযুক্তি বানিয়েছিলেন - মানুষের বিশ্বাস মুছে দেওয়ার - সেটা কি আপনি বিশ্বাস থেকে করেছিলেন? নাকি কারো চাপে?
লুকাস থামেন। পিছন ফেরেন না। কিন্তু কাঁধ একটু নুয়ে পড়ে। রহমান বেরিয়ে যায়।
কিন্তু বাইরের লড়াইয়ের চেয়ে ভেতরের লড়াই কঠিন।
একদিন। মান্নান আসে। মুখ ভার। ভাই, একটা কথা বলব। বল। আমাদের দলে কেউ কেউ আছে - যারা ঠিক নেই। মানে? মানে তারা বাইরে আমাদের মতো। কিন্তু ভেতরে - তারা রিপোর্ট করছে। সিস্টেমকে। আমাদের গতিবিধি। আমাদের পরিকল্পনা।
রহমান স্থির হয়ে যায়। কারা? নাম জানি না। কিন্তু বুঝতে পারছি। কারণ কয়েকবার এমন হয়েছে - আমরা পরিকল্পনা করেছি গোপনে। পরদিন সিস্টেম সেই জায়গায় পৌঁছে গেছে।
রহমান চুপ করে থাকে। ভেতরের শত্রু। এটা বাইরের শত্রুর চেয়ে বেশি কষ্টের। সে ফারুক আলীর কাছে যায়। আব্বু, এই সমস্যা কীভাবে সামলাব?
ফারুক আলী বলেন, পুত্র, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথেও এই সমস্যা হয়েছিল। মুনাফিক। বাইরে মুসলমান। ভেতরে শত্রু। তখন কী করতেন তিনি? প্রথমত - তাদের দূরে সরাননি। কারণ দূরে সরালে তারা পুরোপুরি শত্রুপক্ষে চলে যায়। দ্বিতীয়ত - গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাদের জানাননি। তৃতীয়ত - দোয়া করেছেন। হয়তো তাদের হৃদয় বদলাবে।
রহমান শোনে। কিন্তু এতে তো তারা ক্ষতি করতেই থাকবে। হ্যাঁ। কিছুটা। কিন্তু জানিস - যে সত্যের পথে আছে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো - সে লুকিয়ে কাজ করে না। তাই লুকানো কিছু নেই। যা করছ সবার সামনে করছে। মিথ্যাকে লুকাতে হয়। সত্য লুকায় না।
রহমান একটু ভাবে। তাহলে আমাদের কাজ বদলাব না। শুধু সতর্ক থাকব। হ্যাঁ। আর একটা কাজ কর। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করো। হয়তো একদিন তারাই ফিরে আসবে।
সেই সপ্তাহে। কোয়েল আসে। মুখে একটা কষ্টের ছায়া। রহমান, আমার পরিবার জেনে গেছে। কী জেনেছে? আমি মুসলিম হয়েছি। আমার মা বলেছেন - তুই কি পাগল হয়েছিস? এই শহরে এটা করলে তোর ভবিষ্যৎ নেই। আমার ভাই বলেছেন - তোকে পরিবার থেকে বের করে দেব।
রহমান শোনে। তুমি কী বললে? কিছু বলিনি। শুধু বলেছি - আমি মিথ্যা দিয়ে বাঁচতে চাই না। তারপর? তারপর চলে এসেছি।
কোয়েলের চোখে জল। রহমান, এত কষ্ট। পরিবার চলে গেছে। চাকরি নেই। এখন কোথায় যাব?
রহমান বলে, আস-সিরাতে। সেখানে তোমার জায়গা আছে। কিন্তু পরিবার - পরিবার হারানো কষ্টের। অনেক কষ্টের। কিন্তু মনে রেখো - যে আল্লাহর জন্য কিছু ছাড়ে আল্লাহ তার বিনিময়ে আরো ভালো কিছু দেন। হয়তো এখনই না। কিন্তু নিশ্চই দেবেন।
কোয়েল মাথা নত করে। আমি কি ঠিক করলাম? হ্যাঁ। তুমি ঠিক করেছ। এই শহরে ঠিক করাটাই সবচেয়ে কঠিন।
অন্যদিকে - নেভি এখন সরাসরি বিরোধ করছেন না। কিন্তু পরোক্ষ চাপ বাড়ছে। রহমানদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যায়। কোনো কারণ দেখানো হয় না। মসজিদের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়। প্রযুক্তিগত সমস্যা বলা হয়। শাইখ খালিদকে আবার জিজ্ঞাসাবাদে ডাকা হয়।
রহমান এক রাতে একা বসে। হিসাব করে। টাকা নেই। মসজিদে আলো নেই। শাইখ চাপে আছেন। সে একটু হাসে। মান্নান পাশে। হাসছিস কেন? ভাবছিলাম - তারা মনে করে টাকা আর আলো বন্ধ করলে আমরা থামব। কিন্তু তারা জানে না - আমরা অন্ধকারে পথ চলতে শিখেছি।
মান্নান বলে, কিন্তু সত্যিই সমস্যা। মানুষের খাওয়া লাগবে। মসজিদে আলো লাগবে। লাগবে। কিন্তু কোথা থেকে আসবে জানিস? কোথা থেকে? যারা ফিরে এসেছে তাদের থেকে। তারাই এই পথের মানুষ। তারাই এই পথের সম্পদ।
পরদিন রহমান সবাইকে ডাকে। পরিস্থিতি বলে। সাথে সাথে মানুষ এগিয়ে আসে। কেউ টাকা দেয়। কেউ সময় দেয়। কেউ দক্ষতা দেয়। কিছু ডাক্তার বিনামূল্যে চিকিৎসা করেন। কোয়েল শিশুদের পড়ায়। মান্নান মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়। সিস্টেম একটা দরজা বন্ধ করে। অন্য দশটা খুলে যায়।
দুসপ্তাহ পরে। লুকাস মর্গ্যান রহমানের কাছে আসেন। চেহারা বদলেছে। চোখে এখন সেই উত্তেজনা নেই। আমি তোমার সাথে কথা বলেছিলাম। তারপর থেকে ঘুমাতে পারছিলাম না। একদিন রাতে নিজেকে প্রশ্ন করলাম - আমি কেন এই প্রযুক্তি বানিয়েছিলাম? নেভি বলেছিলেন মানুষের মুক্তির জন্য। কিন্তু সত্যিকার মুক্তি কি? আমি উত্তর খুঁজতে গিয়ে কুরআন পড়লাম। প্রথমবার। শুধু পড়তে। একটা আয়াতে আটকে গেলাম - নিশ্চয়ই মানুষকে আমরা সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছি।
রহমান শোনে। তারপর নিজেকে দেখলাম। আমি সেই সর্বোত্তম সৃষ্টি। কিন্তু আমি কি ছিলাম? মানুষের বিশ্বাস মুছে দেওয়ার যন্ত্র বানাচ্ছিলাম। সেই রাতে প্রথমবার কাঁদলাম।
লুকাসের গলা ভাঙে। আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি। তুমি কি - ক্ষমা আল্লাহর কাছে চাও। আমার কাছে চাওয়ার কিছু নেই। তুমি আমার ক্ষতি করনি। তুমি নিজের ক্ষতি করেছিলে।
লুকাস বলেন, আমি এখন কী করব? তোমার প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তি দিয়ে এখন মানুষের উপকার করো। যে জ্ঞান দিয়ে ক্ষতি করেছিলে সেই জ্ঞান দিয়ে মেরামত করো।
লুকাস মাথা নাড়েন। আমি পারব কিনা জানি না। যে সত্যিকারভাবে চেষ্টা করে আল্লাহ তাকে পথ দেন। তুমি চেষ্টা করো।
সেই রাতে। রহমান একা। খাতা খুলে। সেই পুরনো কবিতা। যেটা কোথা থেকে এসেছিল জানত না। যদি পাশে থাকো তুমি প্রিয় তবে মনে রেখো, আমি ধ্বংসযজ্ঞ করে আবারও নতুন করে সাজাবো এই পৃথিবী।
সে থামে। এই লাইন। ধ্বংসযজ্ঞ। নতুন করে সাজানো। এই শহরকে বদলাতে হলে আগে অনেক কিছু ভাঙতে হবে। যা মিথ্যা দিয়ে তৈরি। যা অন্যায় দিয়ে তৈরি। কিন্তু ভাঙা মানে ধ্বংস করা নয়। ভাঙা মানে - যা মরিচা ধরেছে তা সরিয়ে নতুন করে গড়া।
সে পরের পঙক্তি লিখে ফেলে। যদি মজলুম হয়ে থাকো প্রিয়, তবে হাতে হাত তুমি রাখো। আমি উপাড়ি ফেলিবো আবারও সিংহাসন গড়িবো ন্যায়ের কাঠামো।
সিংহাসন। কোনো রাজার সিংহাসন নয়। এটা সেই মুকুট - যেটা স্বপ্নে দেখেছিল। যেটা অন্যায়ের প্রতীক। সেটা উপড়ে ফেলতে হবে। সেখানে গড়তে হবে ন্যায়ের কাঠামো। এই কাজ একদিনের নয়। এক বছরের নয়। এটা একটা প্রজন্মের কাজ। হয়তো একাধিক প্রজন্মের।
পরদিন। ফারুক আলী একটা ছোট্ট বৈঠক ডাকেন। রহমান, মান্নান, কোয়েল, জিংকা, তারিক, লুকাস - সবাই। তোমাদের সাথে কিছু কথা বলব। আমি অনেক বছর দেখেছি। শিখেছি। ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে শুধু বিতর্ক জেতা যথেষ্ট নয়। শুধু মসজিদ খোলা যথেষ্ট নয়। ইসলাম মানে একটা জীবনব্যবস্থা। সেই জীবনব্যবস্থা দেখাতে হবে। কথায় নয়। কাজে।
সবাই শোনে। মানুষ তখনই আকৃষ্ট হয় যখন দেখে - এই মানুষগুলো ভিন্ন। তারা সৎ। তারা ন্যায়বান। তারা কষ্টে পড়লে হাহাকার করে না। সুখে পড়লে অহংকার করে না। এটাই ইসলামের সবচেয়ে বড় দাওয়াত। তোমাদের চরিত্র।
রহমান শোনে। ফারুক আলী বলেন, ২০২৫ সালে যখন ইসলাম দুর্বল হতে শুরু করেছিল - তখন আমাদের পূর্বপুরুষ একা দাঁড়িয়েছিল। সে শুধু কথা বলেনি। সে জীবন দিয়ে দেখিয়েছিল। মানুষ দেখেছিল। তোমরাও সেই পথে। কিন্তু মনে রেখো - এই পথে যারা হাঁটে তাদের চরিত্র হয় তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
লুকাস একটু নড়ে বসেন। আমি আমার অনেক ভুল আছে। অনেক কিছু ক্ষতি করেছি। আমি কি এই পথে হাঁটতে পারব?
ফারুক আলী তার দিকে তাকান। পুত্র, আল্লাহ তওবা কবুল করেন। যে সত্যিকারভাবে ফেরে - আল্লাহ তাকে ফেরান। তুমি ফিরছ। এটাই যথেষ্ট।
সেই রাতে। রহমান ছাদে। একা। শহরের কৃত্রিম আকাশের দিকে তাকিয়ে। সে ভাবে - এই শহরে কত কিছু বদলেছে। কত মানুষ ফিরেছে। কত লড়াই হয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক পথ।
মান্নান এসে পাশে বসে। কী ভাবছিস? ভাবছি - এই শহরে একদিন সত্যিকারের আকাশ দেখা যাবে। কৃত্রিম নয়। আসল। যে আকাশে তারা থাকে। যে আকাশে চাঁদ ওঠে। যে আকাশ দেখে মানুষ বলে - এত সুন্দর জিনিস এমনিতে হয় না।
মান্নান বলে, সেদিন আসবে? রহমান বলে, আসবে। হয়তো আমি দেখব। হয়তো দেখব না। কিন্তু আসবে। কারণ আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন - যারা সত্যের পথে থাকে তাদের জন্য আলো আসে।
মান্নান বলে, আর যদি না আসে আমাদের জীবনে? রহমান একটু থামে। তাহলেও। কারণ আমরা ফল খাওয়ার জন্য গাছ লাগাই না। আমরা গাছ লাগাই কারণ গাছ লাগানো উচিত। পরের প্রজন্ম ফল খাবে। এটাই শপথ।
দুজন চুপ করে বসে থাকে। শহরের আলো নিচে জ্বলছে। কিন্তু তাদের বুকে একটা আলো জ্বলছে যেটা কোনো সিস্টেম নেভাতে পারেনি। আর সেই আলো প্রতিদিন একটু একটু করে আরো বড় হচ্ছে।

পর্ব ১৪

এক শান্ত সন্ধ্যায় রহমান বাবার পাশে বসে। কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ স্পর্শ করছে না।
রহমান অনেকদিন ধরে একটা প্রশ্ন বুকে রেখেছিল। আজ বলে ফেলে। আব্বু, আমি একটা জিনিস বুঝতে চাই। ২০২৫ সালে। যখন সব শুরু হয়েছিল। যখন ধর্ম থেকে মানুষ দূরে যেতে শুরু করেছিল। তখন কি কিছু করা যেত? এমন কিছু, যা করলে এই দুইশ বছরের অন্ধকার আসতই না? মানুষ তো তখন মুসলিম ছিল। মসজিদ ছিল। কুরআন ছিল। তাহলে কেন সব হারিয়ে গেল?
ফারুক আলী চায়ের কাপ হাতে নেন। কিন্তু খান না। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন। এই প্রশ্নটা আমিও করেছিলাম পুত্র। বন্দী থাকার সময়। রাতের পর রাত। আমি যা বুঝেছি, বলি।
প্রথম কারণ - মানুষ ধর্মকে শুধু আচার বানিয়ে ফেলেছিল। নামাজ পড়ত, কিন্তু নামাজের অর্থ জানত না। রোজা রাখত, কিন্তু রোজার তাৎপর্য বুঝত না। কুরআন পড়ত, কিন্তু অর্থ না জেনে। যখন কোনো কিছু শুধু আচার হয়ে যায়, তার ভেতরের শক্তি হারিয়ে যায়। তখন বাইরের চাপ এলে ভেতরে কিছু নেই ধরে রাখার জন্য।
রহমান মাথা নাড়ে।
দ্বিতীয় কারণ - যারা ধর্মের নামে কথা বলত, তাদের অনেকের চরিত্র মানুষকে আকৃষ্ট করত না। বরং দূরে ঠেলে দিত। কেউ কেউ ধর্মকে ব্যবহার করত ক্ষমতার জন্য। কেউ কেউ কঠোরতা দেখাত, কিন্তু রহমত দেখাত না। ফলে মানুষ ধর্মকে দেখত একটা বোঝা হিসেবে, মুক্তি হিসেবে নয়। ছেলেরা দেখত - যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি ধর্মের কথা বলে, সে-ই সবচেয়ে কম দয়ালু, সবচেয়ে বেশি বিচারক। এটা তাদের দূরে ঠেলে দিয়েছিল।
রহমান চুপ করে শোনে। এই কথাগুলো তার নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়।
তৃতীয় কারণ - যখন প্রযুক্তি আর বিজ্ঞান প্রশ্ন তুলত, মুসলিমরা উত্তর দেওয়ার বদলে রক্ষণাত্মক হয়ে যেত। বলত - প্রশ্ন করো না, বিশ্বাস করো। কিন্তু এই প্রজন্ম প্রশ্ন না করে বিশ্বাস করতে পারত না। আর যখন কেউ উত্তর দিল না, তখন নাস্তিকরা সেই শূন্যতায় ঢুকে পড়ল। তারা প্রশ্নের জবাব দিল - যদিও ভুল জবাব। কিন্তু অন্তত জবাব দিল। মানুষ একটা ভুল উত্তরকেও কোনো উত্তর নেই এর চেয়ে বেশি পছন্দ করে।
রহমান বলে, তাহলে কী করা উচিত ছিল?
ফারুক আলী এবার তাকান ছেলের দিকে। চোখে দৃঢ়তা। যা তুমি করছ। ঠিক এটাই। প্রথমত - প্রশ্নকে ভয় না পাওয়া। ইসলাম প্রশ্নের ধর্ম। ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম প্রশ্ন করেছিলেন - আমার পালনকর্তা, আমাকে দেখান কীভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করেন। আল্লাহ তাকে দোষ দেননি। দেখিয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত - চরিত্র দিয়ে দাওয়াত দেওয়া। কথায় নয়, কাজে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় এত বছর শুধু কথা বলেননি। তিনি বাস করেছিলেন। মানুষ তার সততা দেখেছিল। তার দয়া দেখেছিল। তখন কথাগুলো বিশ্বাসযোগ্য হয়েছিল।
তৃতীয়ত - জ্ঞানের সাথে বিশ্বাসের সংযোগ। মুসলিমদের একসময় ছিল সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিকিৎসক। ইবনে সিনা, আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে রুশদ - তারা বিজ্ঞান আর ধর্ম একসাথে রেখেছিলেন। কিন্তু পরে এই দুটো আলাদা হয়ে গেল। যেন বিজ্ঞান পড়লে ধর্ম ছাড়তে হবে, আর ধর্ম রাখলে বিজ্ঞান বুঝা যাবে না। এই বিভাজনটাই ছিল সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
চতুর্থত – হাদিসকে কুরআনের মত বরং তার চেয়েও বেশি প্রাধান্য দেওয়া। সেই সময় আলেমরাই কুরআন রেখে হাদিসের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছিল। তারা বলত – হাদিস ও কুরআন একটি পাখির দুটি ডানা।অথচ আল্লাহ বলেছেন, এই কুরআনই হলো একমাত্র জীবন বিধান।তারা এমনটা করত কেননা, হাদিস অল্প পড়েই আল্লাহওয়ালা পরিচয় দেওয়া যেত আর যে যতবড় জুব্বাওলা, মাহফিলে তার ততবেশি দাম। ধর্মের ভিতর যতবেশি বিভাজন, তার অধিকাংশই হয়েছে হাদিস দ্বারা। সেই সময়ের মানুষদের বোঝানো হতো, তিন সুরায় কুরআন খতম। এই আমল করলে কুরআন খতমের তুল্য সওয়াব, ওই আমল করলে সম্পূর্ণ কুরআন পড়ার সওয়াব। সাধারণ মানুষ তখন অর্থ বুঝে পড়ার পরিবর্তে অজানা আরবী ভাষায় শুধু পড়তো আর চুম্বন করে রেখে দিতে। ফতোয়া নিত সেই সকল হাদিস পূজারীদের কাছ থেকে। এভাবে মানুষজন সত্যবিমুখ হয়ে যেতে লাগলো। আর আলেমগণ নোংরা রাজনীতির খপ্পরে আরো উগ্র, হিংস্র, লোভী হতে লাগলো।
রহমান চুপ করে বসে থাকে। অনেক কিছু বুঝতে পারছে।
আব্বু, তাহলে এখন আমাদের কাজ - এগুলোই ঠিক করা? হ্যাঁ। প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। চরিত্র দিয়ে দেখানো। জ্ঞানকে বিশ্বাসের সাথে যুক্ত করা। কুরআনকে একমাত্র জীবন বিধান হিসেবে মান্য করে হাদিসকে কেবলই জ্ঞানার্জনের জন্য প্রাধান্য দেওয়া। লোভ থেকে মুক্ত হওয়া। কারণ সেই সময় লোভের বশবর্তী হয়ে তারা ধর্ম ব্যবসায়ী হয়েছিল। তুমি লোভকে কখনও প্রাধান্য দেবেনা। কিন্তু এখন আরো বড় পরীক্ষা সামনে। কী পরীক্ষা?
ফারুক আলী একটু থামেন। এবারের বিতর্ক, একটা বড় বিতর্ক। সারা শহর থেকে। সব জ্ঞানী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ধার্মিক, নাস্তিক - সবাই একসাথে। লাইভে। গোটা দেশ দেখবে। এটা শুধু তোমার পরীক্ষা নয়। এটা ইসলামের পরীক্ষা। এই শহরে। এই সময়ে। আল্লাহ আমাদের সহায়তা করবেন।
কয়েকদিন পরে। নিও-জেডার সবচেয়ে বড় হলঘর - গ্র্যান্ড সিন্থেসিস হল। যেখানে দশ হাজার মানুষ একসাথে বসতে পারে। আর সম্প্রচার হবে সারা পৃথিবীতে। কোটি কোটি মানুষ দেখবে। বিষয় - বিশ্বাস বনাম ভবিষ্যৎ: চূড়ান্ত সংলাপ।
এই বিতর্কের আয়োজক স্বয়ং একটা স্বাধীন কমিটি - যেখানে নেভি, লুকাস (এখন পরিবর্তিত), অ্যাভা, ড. লিরা - সবাই আছেন। উদ্দেশ্য - প্রথমবার একটা সৎ, নিরপেক্ষ মঞ্চ তৈরি করা।
প্রতিপক্ষে থাকবেন - বিশ্বের সবচেয়ে বড় দার্শনিক, বিজ্ঞানী, এবং চিন্তকরা - যারা নাস্তিকতা, অজ্ঞেয়বাদ, এবং প্রযুক্তি-নির্ভর জীবনদর্শনের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর ইসলামের পক্ষে - একজনই। আব্দুর রহমান।
মান্নান যখন শোনে, চমকে যায়। একা? ভাই, ওদিকে দশজন স্কলার, বিজ্ঞানী! রহমান শান্ত। সত্যের পক্ষে সংখ্যা লাগে না। একজনই যথেষ্ট, যদি সে আল্লাহর সাথে থাকে।
ফারুক আলী ছেলের কাঁধে হাত রাখেন। তুমি একা যাবে না। তোমার সাথে থাকবে ষোলো'শ বছরের ইতিহাস। থাকবে আমাদের পূর্বপুরুষদের শপথ। থাকবে আমার দোয়া। আর থাকবেন আল্লাহ।
সেই রাত আসে। গ্র্যান্ড সিন্থেসিস হল ভর্তি। দশ হাজার মানুষ। স্ক্রিনে চলছে লাইভ কাউন্ট - এই মুহূর্তে চার কোটি মানুষ দেখছে অনলাইনে। মঞ্চে দশটি চেয়ার একপাশে। বিপরীত পাশে একটি চেয়ার।
রহমান প্রবেশ করে। সাদা পাঞ্জাবি। প্রথমবার প্রকাশ্যে এমন পোশাকে। দর্শকদের মধ্যে গুঞ্জন। কেউ কেউ হাততালি দেয়। কেউ কেউ শিস দেয় বিরক্তিতে।
রহমান বসে। চোখ বন্ধ করে। ঠোঁট নড়ে - দোয়া। রাব্বি ইশরাহ লী সদরী, ওয়া ইয়াসসির লী আমরী। হে আমার প্রভু, আমার বুক প্রশস্ত করো, আমার কাজ সহজ করো।
সঞ্চালক - একজন নিরপেক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক, নাম ভেরিটাস - ঘোষণা করে। সম্মানিত দর্শক, আজকের বিতর্কে দশজন প্রশ্নকর্তা থাকবেন। প্রতিজন একটি মৌলিক প্রশ্ন করবেন। উত্তরদাতা - আব্দুর রহমান। নিয়ম একটাই - সততা।
প্রথম প্রশ্ন - অস্তিত্বের প্রমাণ
প্রথম প্রশ্নকর্তা - প্রফেসর হেলেনা ভস্ক, কোয়ান্টাম পদার্থবিদ। মিস্টার রহমান, আপনি বলেন ঈশ্বর আছেন। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স দেখায় - মহাবিশ্ব শূন্য থেকেও উদ্ভূত হতে পারে। কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন থেকে কণা তৈরি হতে পারে কোনো কারণ ছাড়াই। তাহলে মহাবিশ্বের জন্য একজন স্রষ্টা প্রয়োজন কেন?
রহমান কিছুক্ষণ ভাবেন। তারপর শান্ত গলায় বলেন। প্রফেসর, আপনি বললেন শূন্য থেকে। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্সের শূন্য আসলে শূন্য নয়। এটা একটা কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম - যার নিজস্ব নিয়ম আছে, শক্তি-ক্ষেত্র আছে, সম্ভাবনা আছে। প্রশ্ন হলো - এই নিয়ম, এই ক্ষেত্র, এই সম্ভাবনা - এগুলো কোথা থেকে এলো? আপনি শূন্য বলছেন এমন একটা জিনিসকে যার আসলে কাঠামো আছে। এটা দার্শনিক অর্থে শূন্য নয়। আসল প্রশ্ন হলো - সম্পূর্ণ শূন্য থেকে কি কিছু তৈরি হতে পারে? যেখানে কোনো নিয়ম নেই, কোনো শক্তি নেই, কোনো সম্ভাবনা নেই - সেখান থেকে? বিজ্ঞান এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। কারণ বিজ্ঞান কাজ করে এমন একটা মহাবিশ্বের মধ্যে যেখানে নিয়ম আছে। নিয়মের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞান নিজেই নিয়মের ভেতরে থেকে চেষ্টা করছে - এটা একটা যুক্তিগত বৃত্ত। কুরআনে বলা হয়েছে - তারা কি কোনো স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই স্রষ্টা? এই প্রশ্নটা ১৬০০ বছর আগে করা হয়েছিল। আজও এর কোনো বৈজ্ঞানিক উত্তর নেই ঈশ্বর ছাড়া।
প্রফেসর ভস্ক কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর মাথা নাড়েন - সম্মতি নয়, কিন্তু স্বীকৃতি। এটা একটা বৈধ দার্শনিক বিষয়।
দ্বিতীয় প্রশ্ন - যন্ত্রণার সমস্যা
দ্বিতীয় প্রশ্নকর্তা - ডক্টর সামির এল-রাজি, নীতিশাস্ত্রবিদ। ইনি একসময় ধার্মিক ছিলেন, এখন অজ্ঞেয়বাদী। রহমান, যদি আল্লাহ থাকেন, এবং তিনি দয়ালু হন - তাহলে পৃথিবীতে এত যন্ত্রণা কেন? শিশুরা ক্ষুধায় মরে। নিরীহ মানুষ যুদ্ধে মরে। আপনার বাবা পঁচিশ বছর বন্দী ছিলেন। একজন দয়ালু সর্বশক্তিমান সত্তা এসব হতে দেন কীভাবে?
হলঘরে নীরবতা। এটা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন।
রহমান একটু সময় নেন। তার চোখ একবার বাবার দিকে যায়, যিনি দর্শকের সারিতে বসে আছেন। ডক্টর এল-রাজি, এই প্রশ্নটা আমি নিজেও করেছিলাম। আমার বাবার জন্য। আমি তিনটা জিনিস বলব। প্রথম - স্বাধীন ইচ্ছা। আল্লাহ মানুষকে পুতুল বানাননি। স্বাধীনতা দিয়েছেন। স্বাধীনতা থাকলে অপব্যবহারও সম্ভব। যদি আল্লাহ জোর করে সবাইকে ভালো বানাতেন - তাহলে ভালোবাসা, ত্যাগ, সাহস - এসবের কোনো মূল্য থাকত না। আমার বাবা যে সত্যের জন্য কষ্ট সহ্য করেছেন - এই কষ্টটাই তার ভালোবাসাকে প্রমাণ করে। যদি কষ্ট সম্ভব না হতো, তার বিশ্বাসও অর্থহীন হতো। দ্বিতীয় - এই জীবন সম্পূর্ণ গল্প নয়। এটা একটা অধ্যায়। আপনি যদি একটা সিনেমার মাঝখানে দেখেন একজন নায়ক খুব কষ্ট পাচ্ছে - আপনি কি বলবেন পরিচালক নিষ্ঠুর? নাকি বলবেন - অপেক্ষা করো, শেষটা দেখো? ইসলাম বলে - এই জীবনের পরে আরেকটা জীবন আছে। যেখানে প্রতিটা অন্যায়ের হিসাব হবে। প্রতিটা কষ্টের প্রতিদান হবে। আমার বাবা পঁচিশ বছর যা সহ্য করেছেন - সেটা আল্লাহর কাছে নষ্ট হয়নি। সেটা জমা আছে। তৃতীয় - কষ্ট নিজেই একটা শিক্ষক। আমি যদি কখনো কষ্ট না পেতাম, আমি কখনো আল্লাহকে খুঁজতাম না। আমার সবচেয়ে অন্ধকার রাতগুলোই আমাকে সবচেয়ে কাছে নিয়ে গেছে। আপনি যদি যন্ত্রণাহীন একটা পৃথিবী চান - সেটা হবে এমন একটা পৃথিবী যেখানে কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারবে না, কারণ কারো সাহায্যের প্রয়োজন হবে না। কেউ সাহস দেখাতে পারবে না, কারণ ভয়ের কিছু থাকবে না। কেউ ক্ষমা করতে পারবে না, কারণ ভুল হবে না। সেই পৃথিবী মানুষের পৃথিবী নয়। সেটা যন্ত্রের পৃথিবী।
ডক্টর এল-রাজি অনেকক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর আস্তে বলেন, আমার ছেলে মারা গিয়েছিল দশ বছর আগে। সেই থেকে আমি এই প্রশ্ন করি। আজ প্রথমবার... কেউ এটাকে উড়িয়ে না দিয়ে উত্তর দিল।
রহমান নরম গলায় বলেন, আমি আপনার ছেলের জন্য দোয়া করব। আর ডক্টর - যন্ত্রণার উত্তর শুধু যুক্তি নয়। যন্ত্রণার উত্তর সঙ্গ। আল্লাহ বলেন - নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সাথে আছি। এই সাথে থাকাটাই আসল উত্তর।
তৃতীয় প্রশ্ন - বিজ্ঞানের অগ্রগতি
তৃতীয় প্রশ্নকর্তা - ড. লুকাস মর্গ্যানের সহকর্মী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ অ্যালান চেন। ইনি এখনো রহমানের বিরুদ্ধে। রহমান, আপনি যদি সঠিক হন, তাহলে কেন গত দুইশ বছরে সব বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এসেছে ধর্মহীন সমাজ থেকে? ধর্মীয় সমাজগুলো পিছিয়ে পড়েছে। এটা কি প্রমাণ করে না যে ধর্ম জ্ঞানের পথে বাধা?
রহমান বলেন, মিস্টার চেন, আসুন ইতিহাস দেখি। মধ্যযুগে, যখন ইউরোপ অন্ধকার যুগে ছিল, মুসলিম বিশ্ব ছিল জ্ঞানের কেন্দ্র। আল-জাবর - অ্যালজেব্রা - একজন মুসলিম গণিতবিদের নাম থেকে এসেছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের ভিত্তি ইবনে সিনার বই থেকে এসেছে, যা ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী পড়ানো হয়েছে। অপটিক্সের ভিত্তি ইবনে আল-হাইসামের কাজ থেকে এসেছে। এই সবকিছু হয়েছিল যখন এই বিজ্ঞানীরা গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। তারা বিজ্ঞানকে দেখতেন আল্লাহর সৃষ্টি বোঝার একটা উপায় হিসেবে। কুরআনে বলা হয়েছে - তারা কি আকাশের দিকে তাকায় না, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে? তাহলে ধর্ম বিজ্ঞানের বাধা ছিল না। বরং একসময় প্রেরণা ছিল। তারপর কী হলো? মুসলিম বিশ্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে পিছিয়ে পড়ল। সেটা ধর্মের ব্যর্থতা নয় - মানুষের ব্যর্থতা, নেতৃত্বের ব্যর্থতা, শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা। আর আজকের ধর্মহীন সমাজগুলোর অগ্রগতি - সেটাও মানুষের প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টার সক্ষমতা কে দিয়েছে? মানুষের মস্তিষ্ক, যুক্তিবোধ, কৌতূহল - এসবের উৎস কোথায়? আল্লাহ মানুষকে আকল - বুদ্ধি - দিয়েছেন। সেই বুদ্ধি ব্যবহার করে মানুষ বিজ্ঞানকে উন্নত করছে - এটা আল্লাহর দেওয়া উপহারের সঠিক ব্যবহার, আল্লাহকে অস্বীকার করার প্রমাণ নয়। একটা শিশু যদি তার বাবার দেওয়া সরঞ্জাম দিয়ে একটা সুন্দর বাড়ি বানায়, তারপর বলে - দেখো, আমার কোনো বাবা নেই, কারণ আমি নিজেই বাড়ি বানিয়েছি - এটা কি যুক্তিযুক্ত?
হলঘরে হাসির শব্দ - কিন্তু সমর্থনের হাসি। অ্যালান চেন একটু বিরক্ত হন। এটা তুলনা। প্রমাণ নয়। আপনি প্রমাণ চাইছেন এমন একটা প্রশ্নের যেটা মূলত একটা দার্শনিক প্রশ্ন। বিজ্ঞান কীভাবে বলে। দার্শন কেন বলে। আপনি একটা কেন প্রশ্নকে কীভাবের মাপকাঠিতে মাপতে চাইছেন। এটা একটা শ্রেণী ত্রুটি।
চতুর্থ প্রশ্ন - নারীর অধিকার
চতুর্থ প্রশ্নকর্তা - সুজান ক্লার্ক, মানবাধিকার কর্মী। রহমান, ইসলামে নারীদের অধিকার সীমিত - ইতিহাস তাই দেখায়। আজকের যুগে, যখন সমতা গুরুত্বপূর্ণ - আপনি কীভাবে এমন একটা ব্যবস্থা প্রচার করেন যা নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানায়?
রহমান এই প্রশ্নে একটু সোজা হয়ে বসেন। মিস ক্লার্ক, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এবং আমি চাই সৎভাবে উত্তর দিতে। প্রথমত - ইসলাম এবং মুসলিম সমাজ - দুটো আলাদা জিনিস। অনেক জায়গায় যা নারীদের সাথে করা হয়েছে - জোরপূর্বক বিয়ে, শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া, সহিংসতা - এসবের কোনো ভিত্তি কুরআনে নেই। এসব সাংস্কৃতিক প্রথা, যা ধর্মের নামে চালানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত - ষোলোশো বছর আগে, যখন বিশ্বের কোথাও নারীদের সম্পত্তির অধিকার ছিল না, কুরআন নারীদের উত্তরাধিকারের অধিকার দিয়েছিল। যখন নারীদের মতামত কোনো মূল্য পেত না, ইসলাম নারীদের বিয়েতে সম্মতির অধিকার দিয়েছিল। আয়েশা রা. - নবীজির স্ত্রী - তিনি ছিলেন একজন পণ্ডিত, শিক্ষক, এমনকি যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী। তৃতীয়ত - সমতা মানে কি অভিন্নতা? ইসলাম বলে - পুরুষ আর নারী সমান মর্যাদার, কিন্তু সমান দায়িত্বের নয়। যেমন একটা শরীরে হাত আর পা সমান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাদের কাজ ভিন্ন। এটা অসমতা নয় - এটা পরিপূরকতা। আজকের যে সমাজে আমরা বাস করি - যেখানে সমতা মানে নারী-পুরুষের জৈবিক পার্থক্য অস্বীকার করা - সেখানে নারীরা কি সত্যিই বেশি সুখী? পরিসংখ্যান বলে - বিষণ্নতা, একাকীত্ব, পরিবার ভাঙন - এসব সবচেয়ে বেশি সেই সমাজগুলোতেই যারা মুক্তির নামে পরিবারের কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। আমি বলছি না ইসলামের ইতিহাসে সব ঠিক ছিল। মানুষ ভুল করেছে। কিন্তু ইসলামের নীতি আর মানুষের ভুল প্রয়োগ - এই দুটোকে আলাদা করতে হবে।
সুজান ক্লার্ক চিন্তিতভাবে নোট লেখেন। আমি এটা নিয়ে আরো পড়ব। যেকোনো সময় - আমাদের কমিউনিটিতে নারীরাই এখন সবচেয়ে বেশি কথা বলেন এই বিষয়ে। তাদের সাথে কথা বলুন। শুধু আমার সাথে নয়।
পঞ্চম প্রশ্ন - সহিংসতার ইতিহাস
পঞ্চম প্রশ্নকর্তা - জেনারেল (অব.) মার্কাস ওয়েইন, সামরিক ইতিহাসবিদ। ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ আছে, বিজয় আছে, রক্তপাত আছে। জিহাদ শব্দটা আজও ভয়ের প্রতীক। আপনি কীভাবে একটা ধর্মের পক্ষে কথা বলেন যার ইতিহাসে এত সহিংসতা?
রহমান বলেন, জেনারেল, প্রথমে একটা প্রশ্ন - কোন সভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ নেই? রোমান সাম্রাজ্য? ব্রিটিশ সাম্রাজ্য? আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলো - যারা দুটো বিশ্বযুদ্ধ করেছে, পরমাণু বোমা ফেলেছে? ইতিহাসে সহিংসতা থাকা মানে সেই সহিংসতা সেই সভ্যতার মূল আদর্শ - এটা প্রমাণ করে না। এখন জিহাদ শব্দের কথা বলি। জিহাদ মানে সংগ্রাম। এর সবচেয়ে বড় রূপ - নিজের সাথে সংগ্রাম। নিজের লোভ, রাগ, অন্যায় ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এটাকে নবীজি বলেছেন জিহাদে আকবার - সর্ববৃহৎ জিহাদ। সামরিক জিহাদ - কুরআনে এর জন্য স্পষ্ট শর্ত আছে। এটা আত্মরক্ষার জন্য, নিপীড়িতদের রক্ষার জন্য - আগ্রাসনের জন্য নয়। যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের সাথে যুদ্ধ করো, কিন্তু সীমা অতিক্রম করো না। আজকের যুগে যারা ইসলামের নামে সহিংসতা করে - তারা এই নির্দেশনাকে অমান্য করছে, পালন করছে না। একজন সন্ত্রাসী নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করলে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলামের প্রতিনিধি হয়ে যায় না - যেমন একজন খ্রিস্টান যে গির্জায় বোমা মারে, সে খ্রিস্টধর্মের প্রতিনিধি নয়। আমার পরিবারের ইতিহাস দেখুন। আমার বাবা পঁচিশ বছর বন্দী ছিলেন। তিনি প্রতিশোধ নেননি। তিনি ক্ষমা করেছেন। আমি - যাকে এই শহর সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিল - আমি কখনো একটা পাথরও কারো দিকে ছুঁড়িনি। আমার অস্ত্র ছিল শব্দ, যুক্তি, এবং দোয়া। এটাই ইসলামের সত্যিকারের চেহারা।
ষষ্ঠ প্রশ্ন - একাধিক ধর্মের প্রশ্ন
ষষ্ঠ প্রশ্নকর্তা - অধ্যাপক রাজ মেহতা, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদ। পৃথিবীতে হাজারো ধর্ম আছে। প্রতিটা ধর্মের অনুসারীরা মনে করে তাদের ধর্মই সত্য। আপনি কীভাবে নিশ্চিত যে ইসলামই সঠিক, অন্য সব ধর্ম ভুল? এটা কি অহংকার নয়?
রহমান শান্তভাবে বলেন, অধ্যাপক, এটা চমৎকার প্রশ্ন। এবং আমি বলব - এটা অহংকার নয়, এটা যৌক্তিক অনুসন্ধানের ফল। প্রথমত - সব ধর্ম সমানভাবে সত্য হতে পারে না, যদি তাদের মৌলিক দাবি পরস্পরবিরোধী হয়। যদি একটা ধর্ম বলে ঈশ্বর একজন, আরেকটা বলে অনেক - দুটোই একসাথে সত্য হতে পারে না। এটা যুক্তির নিয়ম, ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। দ্বিতীয়ত - আমি ইসলামকে বেছে নিইনি কারণ আমি এতে জন্মেছি। আমি জন্মেছিলাম এমন একটা সমাজে যেখানে ধর্মকে মুছে ফেলা হয়েছিল। আমি প্রতিটা প্রশ্ন করেছিলাম যা একজন বহিরাগত করতে পারে। আমি কুরআন পড়েছি একজন গবেষকের মতো, বিশ্বাসীর মতো নয় - প্রথমে। আমি যা পেয়েছি - একটা গ্রন্থ যা ১৬০০ বছর আগে এসেছে, যাতে এমন কিছু সংকেত আছে যা তখনকার মানুষের জ্ঞানের বাইরে ছিল। একটা নৈতিক ব্যবস্থা যা যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক। একটা ঐতিহাসিক রেকর্ড যা পরিবর্তন হয়নি - আজও পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ একই কুরআন মুখস্থ রাখে, অক্ষরে অক্ষরে। কোনো গ্রন্থের এমন সংরক্ষণ ইতিহাসে নেই। তৃতীয়ত - ইসলাম অন্য নবীদের অস্বীকার করে না। মুসা, ঈসা, ইব্রাহিম, নূহ - সবাই ইসলামের অংশ। ইসলাম বলে - আল্লাহ প্রতিটা জাতির কাছে বার্তাবাহক পাঠিয়েছেন। কিন্তু সময়ের সাথে বার্তা বিকৃত হয়েছে। ইসলাম সেই বার্তার চূড়ান্ত, অবিকৃত সংস্করণ। আমি বলছি না অন্য ধর্মের মানুষ খারাপ মানুষ। আমি বলছি - সত্য একটা। এবং প্রতিটা মানুষের অধিকার আছে সেই সত্য নিজে খুঁজে দেখার। আমি কাউকে জোর করছি না। আমি শুধু আমার পথ, আমার যুক্তি শেয়ার করছি। বাকিটা প্রতিটা মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত। কুরআনেই বলা আছে - দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।
সপ্তম প্রশ্ন - মৃত্যুর পরে কী
সপ্তম প্রশ্নকর্তা - একজন তরুণ, নাম ফিনলি, যিনি দর্শকের সারি থেকে হাত তোলেন। সঞ্চালক তাকে অনুমতি দেয়। রহমান, আমার মা গত বছর মারা গেছেন। ক্যান্সারে। আমি জানতে চাই - সত্যিই কি তিনি কোথাও আছেন? নাকি এটা শুধু সান্ত্বনার জন্য বানানো একটা গল্প?
হলঘর স্তব্ধ। এটা সবচেয়ে আবেগঘন প্রশ্ন।
রহমান কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর নরম গলায়। ফিনলি, আমি তোমার মায়ের জন্য দুঃখিত। আমি তোমাকে সত্যি কথা বলব - আমি প্রমাণ দিতে পারব না। কেউ পারে না। এটাই বিশ্বাসের জায়গা। কিন্তু আমি তোমাকে কিছু চিন্তা করতে বলব। তুমি যখন জন্মেছিলে, তোমার মায়ের গর্ভে তুমি একটা জগৎ চিনতে - অন্ধকার, উষ্ণ, সীমিত। সেখান থেকে যদি কেউ তোমাকে বলত - এর বাইরে আরেকটা জগৎ আছে - আলো, বাতাস, বিশাল আকাশ - তুমি কি বুঝতে পারতে? তোমার তখনকার অস্তিত্ব দিয়ে সেই জগৎ কল্পনা করা অসম্ভব ছিল। কিন্তু সেই জগৎ ছিল। এবং তুমি সেখানে এসেছ। মৃত্যু সেরকম একটা জন্ম। এই জগৎ থেকে আরেকটা জগতে - যেটা আমাদের এখনকার বোঝাপড়ার বাইরে। কুরআনে বলা হয়েছে - প্রতিটা প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। তারপর তোমাদের আমার কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে। তোমার মা - যদি তিনি ভালো মানুষ ছিলেন, যদি তিনি ভালোবেসেছেন, কষ্ট সহ্য করেছেন, চেষ্টা করেছেন - সেই সবকিছু কি শুধু রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া ছিল, যা মৃত্যুর সাথে শূন্যে মিলিয়ে গেছে? নাকি সেই ভালোবাসা, সেই সংগ্রাম - এর একটা অর্থ ছিল, এবং সেই অর্থ চিরস্থায়ী? আমি বিশ্বাস করি - দ্বিতীয়টা সত্য। কারণ যদি প্রথমটা সত্য হতো - তাহলে তোমার মায়ের জীবন, তার ভালোবাসা, তার সংগ্রাম - সবকিছু অর্থহীন হয়ে যায়। এবং আমি বিশ্বাস করি না এত গভীর ভালোবাসা অর্থহীন হতে পারে। তোমার মা আছেন। আল্লাহর কাছে। এবং তোমার দোয়া তার কাছে পৌঁছায়। তুমি যদি তার জন্য দোয়া করো - সেটা তার জন্য উপহার হয়ে যায়।
ফিনলি কাঁদছে। হলঘরে অনেকে কাঁদছে। রহমান বলেন, ফিনলি, আজ রাতে ঘরে গিয়ে তোমার মায়ের জন্য বলো - আল্লাহ, আমার মাকে ক্ষমা করো, তাকে শান্তি দাও। এটা তোমার মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে।
অষ্টম প্রশ্ন - প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ
অষ্টম প্রশ্নকর্তা - ড. লুকাস মর্গ্যান নিজে। এবার বিপক্ষে নয় - কিন্তু প্রশ্নটা কঠিন। রহমান, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরো উন্নত হবে। মানুষের মস্তিষ্ক স্কান করা যাবে, কপি করা যাবে। যদি একদিন প্রমাণ হয় - চেতনা শুধু তথ্য, এবং সেই তথ্য কম্পিউটারে তোলা যায়, আত্মা বলে কিছু পাওয়া না যায় - তখন আপনার বিশ্বাসের কী হবে?
রহমান হাসেন - প্রথমবার এই বিতর্কে। লুকাস, ধন্যবাদ এই প্রশ্নের জন্য। কারণ এটা আমাকে আমার নিজের যাত্রার কথা মনে করায়। প্রথমত - প্রমাণ হয় এই কথাটা ধরে নিচ্ছে যে বিজ্ঞান কখনো এমন কিছু প্রমাণ করতে পারবে যা মূলত পরিমাপের বাইরে। চেতনা স্কান করা মানে মস্তিষ্কের কার্যক্রম স্কান করা। কিন্তু অনুভব করা - যাকে দার্শনিকরা বলেন কোয়ালিয়া - এটা এখনো সম্পূর্ণ ব্যাখ্যার বাইরে। কিন্তু আমি ধরেই নিচ্ছি - যদি এমন হয়। যদি বিজ্ঞান দেখায় মস্তিষ্ক কপি করা সম্ভব। তাহলেও - প্রশ্ন থেকেই যায়। সেই কপিটা কি আমি? নাকি আমার মতো একজন? ধরো তোমার একটা সম্পূর্ণ কপি তৈরি হলো। এই মুহূর্তে। দুটো লুকাস আছে। একজন এখানে বসে আছে, একজন ওই ল্যাবে। দুজনেই বলবে - আমি লুকাস। কিন্তু তুমি - যে এখানে বসে আছ - তুমি কি সেই দুজনের অভিজ্ঞতা একসাথে অনুভব করছ? না। তুমি শুধু এখানের অভিজ্ঞতা অনুভব করছ। তাহলে তুমি কি সেই তথ্য? নাকি তথ্যের চেয়ে বেশি কিছু - একটা ধারাবাহিকতা, একটা আমি-ত্ব - যা কপি করা যায় না, শুধু স্থানান্তর করা যায়? ইসলাম বলে - রুহ, আত্মা - এটা আল্লাহর একটা আমর - নির্দেশ, রহস্য। তারা তোমাকে রুহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলো - রুহ আমার প্রভুর নির্দেশের অন্তর্গত। এবং তোমাদের এ ব্যাপারে সামান্য জ্ঞানই দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান কখনো হয়তো তথ্য বুঝতে পারবে। কিন্তু আমি কেন আমি, অন্য কেউ নই - এই প্রশ্নের উত্তর তথ্যে নেই। তোমার ভয়টা আমি বুঝি, লুকাস। কারণ এই প্রশ্নটা তোমার নিজের জীবনে এসেছিল। তুমি ভয় পেয়েছিলে - যদি আমরা শুধু মেশিন হই, তাহলে আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই, কোনো জবাবদিহিতা নেই। কিন্তু তুমিই বলেছিলে আমাকে - নিশ্চয়ই মানুষকে আমরা সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছি। এই আয়াত পড়ে তুমি কেঁদেছিলে। কেন? কারণ ভেতরে কোথাও তুমি জানতে - তুমি শুধু তথ্য নও।
লুকাস মাথা নিচু করেন। চোখে জল। হলঘরে নিস্তব্ধতা।
নবম প্রশ্ন - যদি ভুল হয়
নবম প্রশ্নকর্তা - একজন তীক্ষ্ণ কণ্ঠের মহিলা, নাম ড. ইরিনা ভলকভ, দর্শনের অধ্যাপক, পরিচিত কঠিন অজ্ঞেয়বাদী হিসেবে। রহমান, ধরা যাক আপনি ভুল। ধরা যাক মৃত্যুর পরে কিছু নেই। আপনি একটা পুরো জীবন কাটালেন - নামাজ, রোজা, নিয়ম-কানুন - সব কিছু এমন একটা সত্তার জন্য যিনি নেই। আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কি এটা নয়?
রহমান বলেন, ড. ভলকভ, এটা পাস্কালের ওয়েজার-এর একটা সংস্করণ। কিন্তু আমি এটাকে একটু ভিন্নভাবে দেখি।
ধরা যাক আপনি ঠিক - কিছুই নেই। তাহলে আমার জীবনটা কেমন কাটল? আমি প্রতিদিন কৃতজ্ঞ থেকেছি। আমি মিথ্যা বলিনি, প্রতারণা করিনি। আমি ক্ষমা করেছি, দান করেছি। আমি আমার পরিবারকে সম্মান করেছি। আমি একটা কমিউনিটি তৈরি করেছি যেখানে মানুষ একে অপরকে সাহায্য করে। আমি প্রতিদিন একটা শৃঙ্খলা মেনেছি - যা আমাকে শান্তি দিয়েছে, উদ্দেশ্য দিয়েছে। এমনকি যদি আল্লাহ না থাকেন - এই জীবন কি অপব্যয়িত হলো? নাকি এটা নিজেই একটা সমৃদ্ধ, অর্থবহ জীবন ছিল?
আর এখন বিপরীত দিক দেখি। ধরা যাক আপনি ভুল - আল্লাহ আছেন। আপনি একটা জীবন কাটিয়েছেন - নিজের ইচ্ছামতো, কোনো দায়বদ্ধতা ছাড়া, শুধু এই মুহূর্তের জন্য। আর মৃত্যুর পরে দেখলেন - আসলে একটা হিসাব ছিল। কোন পরিণতি বেশি গুরুতর?
আমার পথে - দুটো ফলাফলই মোটামুটি ভালো। আপনার পথে - একটা ফলাফল বিপর্যয়কর। কিন্তু ড. ভলকভ, আমি এই উত্তরটা দিচ্ছি না কারণ এটা নিরাপদ বাজি। আমি এই পথে আছি কারণ আমি এটা সত্য বলে বিশ্বাস করি - যুক্তি দিয়ে, অনুভূতি দিয়ে, এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে। কিন্তু আপনার প্রশ্নের সরাসরি জবাব - যদি আমি ভুলও হই, আমার জীবন তবুও একটা সুন্দর জীবন ছিল। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য - এটা শুধু পরের জীবনের জন্য নয়। এটা এই জীবনকেও অর্থবহ করে।
ড. ভলকভ কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর সামান্য হাসেন - প্রথমবার। এটা... আমি যা প্রত্যাশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশি সৎ উত্তর।
দশম প্রশ্ন - সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
দশম এবং শেষ প্রশ্নকর্তা - নেভি নিজে। হলঘরে গুঞ্জন। নেভি, যিনি একসময় রহমানের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলেন, আজ এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে। রহমান। আমার প্রশ্নটা অন্যদের চেয়ে আলাদা। আমি জিজ্ঞেস করছি না ঈশ্বর আছেন কিনা, বা ইসলাম সঠিক কিনা। আমি জিজ্ঞেস করছি - ধরুন এই হলঘরে যে কোটি কোটি মানুষ দেখছে, তাদের মধ্যে কেউ এখন ভাবছে - হয়তো সে ঠিক বলছে। হয়তো আমার ভেতরেও এই তৃষ্ণা আছে। তাদের প্রথম পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত? জটিল কিছু নয়। সবচেয়ে সহজ পদক্ষেপ। আজ রাতে, এই বিতর্কের পরে, তারা কী করবে?
হলঘর সম্পূর্ণ স্তব্ধ। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন - কারণ এটা তত্ত্বের প্রশ্ন নয়, কাজের প্রশ্ন।
রহমান সোজা ক্যামেরার দিকে তাকান। যেন সরাসরি কোটি মানুষের সাথে কথা বলছেন। ধন্যবাদ নেভি। এটাই আসল প্রশ্ন। যারা শুনছেন - আপনাদের কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে না আজ রাতে। কোনো ঘোষণা দিতে হবে না। কাউকে কিছু বলতে হবে না। শুধু একটা কাজ করুন। আজ রাতে, যখন সবাই ঘুমিয়ে যাবে, আপনি একা থাকবেন। সেই মুহূর্তে - চোখ বন্ধ করুন। আর বলুন - যদি তুমি থাকো, আমাকে দেখাও। এটুকুই। এই একটা বাক্য। সৎ। কোনো ভনিতা ছাড়া। আমি জানি - কারণ আমিও এটা বলেছিলাম একদিন। একা। আমার ছোট্ট ঘরে। কেউ দেখছিল না। আর সেই রাত থেকে আমার জীবন বদলে গেছে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না যে আপনার জীবনেও নাটকীয় কিছু ঘটবে। কিন্তু আমি বলছি - যে সত্যিকারভাবে খোঁজে, সে কিছু না কিছু পায়। একটা শান্তি। একটা ইঙ্গিত। একটা প্রশ্নের জবাবে আরেকটা প্রশ্ন - কিন্তু এমন একটা প্রশ্ন যা আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এটাই প্রথম পদক্ষেপ। ছোট্ট। কিন্তু এই ছোট্ট পদক্ষেপ থেকেই বড় বড় পরিবর্তন শুরু হয়। আমার বাবা একবার বলেছিলেন - সত্য কখনো মরে না। শুধু সময় নেয়। আজ রাতে, আপনাদের প্রত্যেকের জন্য - সময় শুরু হতে পারে। যদি আপনি চান।
বিতর্ক শেষ হয়। কিন্তু কোনো হাততালি নেই প্রথম কয়েক সেকেন্ড। দশ হাজার মানুষ চুপ। তারপর - ধীরে ধীরে - একটা শব্দ শুরু হয়। হাততালি নয়। মানুষ উঠে দাঁড়াচ্ছে। একে একে। পুরো হলঘর। দশজন প্রশ্নকর্তাও দাঁড়ান। এমনকি ড. ভলকভ এবং অ্যালান চেনও। রহমান উঠে দাঁড়ান। মাথা নত করেন। কিন্তু তার চোখ খুঁজছে একজনকে। দর্শকের সারিতে। ফারুক আলী। বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে জল। কিন্তু মুখে হাসি। ঠোঁট নড়ছে। শব্দ নেই। কিন্তু রহমান বুঝতে পারে। আলহামদুলিল্লাহ।
সেই রাতে। রহমান বাড়ি ফেরে। মান্নান, কোয়েল, জিংকা, তারিক, লুকাস - সবাই অপেক্ষায়। কেউ কথা বলে না। শুধু একে অপরের দিকে তাকায়। তারপর মান্নান হেসে বলে, ভাই... তুই করেছিস। রহমান বলে, আমি করিনি। আল্লাহ করেছেন।
ফারুক আলী ছেলের পাশে বসেন। পুত্র, তোমার মনে আছে সেই কবিতা? যেটা তুমি প্রথম রাতে লিখেছিলে? স্বপ্নের পরে? মনে আছে। শেষ লাইনটা বলো।
রহমান চোখ বন্ধ করে। ধীরে ধীরে বলে। যদি সত্য চাও প্রিয় তবে অকুতোভয় হইও যদি সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে প্রিয় তবে দ্বীপ হয়ে তুমি জ্বলো। আমি বজ্র হয়ে দাঁড়াবো পথে, ভাঙিবো জুলুম জিও। আমি রক্ত ঢেলে আঁকিবো ইতিহাস, তুমি শুধু মোরে লিখে নিয়ো।
ঘরে নীরবতা। ফারুক আলী বলেন, আজ রাতে, কোটি মানুষ এই বজ্রের শব্দ শুনেছে। কিন্তু এটা শেষ বজ্র নয়। এটা প্রথম বজ্র। আরো আসবে। তোমার পরে যারা আসবে - তাদের মাধ্যমে।
পরদিন। সারা শহরে নতুন একটা অনুভূতি। যারা সারারাত ঘুমাতে পারেনি, যারা একা ঘরে চোখ বন্ধ করে বলেছিল - যদি তুমি থাকো, আমাকে দেখাও - তারা সকালে উঠে অনুভব করে কিছু একটা বদলে গেছে। কেউ কেউ এখনো নিশ্চিত নয়। কেউ কেউ এখনো প্রশ্ন করছে। কিন্তু একটা বীজ পোঁতা হয়ে গেছে। আর বীজ একবার পোঁতা হলে, মাটির নিচে কী ঘটছে তা দেখা যায় না। কিন্তু একদিন - ঠিক সময়ে - সেটা মাটি ভেদ করে বের হয়।
রহমান সেই সকালে ছাদে দাঁড়িয়ে। সূর্যোদয় দেখছে। কৃত্রিম নয়। প্রথমবার, এই শহরের আকাশ থেকে কৃত্রিম পর্দা সাময়িকভাবে সরানো হয়েছে - বিতর্কের পরের প্রতীকী উদযাপন হিসেবে। আসল সূর্য। আসল আলো। রহমান চোখ বন্ধ করে। এই আলো তার মুখে পড়ে। উষ্ণ। সে ফিসফিস করে বলে - আল্লাহ, তুমি লিখেছিলে। আমি শুধু কলম ছিলাম। এখন এই কলম আরো অনেকের হাতে যাবে। প্রতিটা প্রজন্মে। প্রতিটা যুগে। কারণ এই শপথ কখনো শেষ হয় না। যতদিন আকাশে মেঘ জমে, যতদিন পৃথিবীতে অন্ধকার আসে, যতদিন মানুষের বুকে সত্যের তৃষ্ণা থাকে - বজ্র পড়বে। আবার। আবার। আবার।
বাতাস বয়ে যায়। শহর জেগে ওঠে - নতুন দিনের জন্য। আর দূরে, কোনো এক ঘরে, একটা শিশু জন্ম নেয়। কেউ জানে না - এই শিশুও একদিন স্বপ্নে একটা মুকুট দেখবে কিনা। একটা ভাঙা সিংহাসন। একটা ডাক। কিন্তু যদি দেখে - সে জানবে কোথায় যেতে হবে। কারণ পথ এখন আছে। আলো এখন আছে। বজ্রের শপথ প্রজন্মের পর প্রজন্ম জীবন্ত থাকবে।
বিজ্ঞাপন